ইসলামী শরীয়তে বিবাহের ক্ষেত্রে নারী এবং পুরুষের বিধানে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ নিজের বিবাহের আকদ নিজেই সম্পন্ন করতে পারে। কিন্তু কোনো নারী নিজে নিজের বিবাহ সম্পন্ন করতে পারে না। নারীর বিবাহের জন্য তার অভিভাবক (ওয়ালি) এর উপস্থিতি ও সম্মতি শর্ত। তাই ছেলে-মেয়ে শুধু নিজেরা রাRead more
ইসলামী শরীয়তে বিবাহের ক্ষেত্রে নারী এবং পুরুষের বিধানে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ নিজের বিবাহের আকদ নিজেই সম্পন্ন করতে পারে। কিন্তু কোনো নারী নিজে নিজের বিবাহ সম্পন্ন করতে পারে না। নারীর বিবাহের জন্য তার অভিভাবক (ওয়ালি) এর উপস্থিতি ও সম্মতি শর্ত। তাই ছেলে-মেয়ে শুধু নিজেরা রাজি থাকলে এবং সাক্ষী রাখলেই বিবাহ হয়ে যায়, এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল এবং সুন্নাহ পরিপন্থী।
কুরআনুল কারীমে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পুরুষদেরকে সরাসরি বিবাহ করার নির্দেশ দিয়েছেন, কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে অভিভাবকদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন তাদের মেয়েদের বিবাহ দেওয়ার জন্য। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَنْكِحُوا الْمُشْرِكَاتِ حَتَّى يُؤْمِنَّ وَلَأَمَةٌ مُؤْمِنَةٌ خَيْرٌ مِنْ مُشْرِكَةٍ وَلَوْ أَعْجَبَتْكُمْ وَلَا تُنْكِحُوا الْمُشْرِكِينَ حَتَّى يُؤْمِنُوا وَلَعَبْدٌ مُؤْمِنٌ خَيْرٌ مِنْ مُشْرِكٍ وَلَوْ أَعْجَبَكُمْ
অর্থ: “আর মুমিন না হওয়া পর্যন্ত তোমরা মুশরিক নারীদের বিবাহ করো না। অবশ্যই একজন মুমিন দাসী একজন মুশরিক স্বাধীন নারীর চেয়ে উত্তম, যদিও সে তোমাদের মুগ্ধ করে। আর মুমিন না হওয়া পর্যন্ত মুশরিক পুরুষদের সাথে (তোমাদের নারীদের) বিবাহ দিয়ো না। অবশ্যই একজন মুমিন দাস একজন মুশরিক স্বাধীন পুরুষের চেয়ে উত্তম, যদিও সে তোমাদের মুগ্ধ করে।” [সূরা আল-বাকারাহ: ২২১]
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা পুরুষদের ক্ষেত্রে ‘লা তানকিহু’ (تَنْكِحُوا – তোমরা বিবাহ করো না) ব্যবহার করেছেন, যা নিজে বিবাহ করার নির্দেশ। কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে ‘লা তুনকিহু’ (تُنْكِحُوا – তোমরা বিবাহ দিয়ো না) ব্যবহার করেছেন, যার অর্থ অভিভাবকদের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তারা নারীদের বিবাহ দেয়।
সালাফে সালেহীন এবং জুমহুর (সংখ্যাগরিষ্ঠ) মুহাদ্দিসীনদের মত হলো, অভিভাবক ছাড়া নারীর বিবাহ সম্পূর্ণ বাতিল। এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ও সহিহ হাদিস রয়েছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
لاَ نِكَاحَ إِلاَّ بِوَلِيٍّ
অর্থ: “অভিভাবক (ওয়ালি) ছাড়া কোনো বিবাহ নেই।” [সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ২০৮৫; আলবানি (রহ.) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন]
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
أَيُّمَا امْرَأَةٍ نَكَحَتْ بِغَيْرِ إِذْنِ وَلِيِّهَا فَنِكَاحُهَا بَاطِلٌ فَنِكَاحُهَا بَاطِلٌ فَنِكَاحُهَا بَاطِلٌ
অর্থ: “যে নারী তার অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিবাহ করবে, তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল।” [সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ২০৮৩; জামে আত-তিরমিজি, হাদিস: ১১০২; আলবানি (রহ.) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন]
আর যে নারী নিজেই নিজের বিবাহ দেয়, তার ব্যাপারে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে অত্যন্ত কঠোর হুঁশিয়ারি এসেছে:
لَا تُزَوِّجُ الْمَرْأَةُ الْمَرْأَةَ وَلَا تُزَوِّجُ الْمَرْأَةُ نَفْسَهَا فَإِنَّ الزَّانِيَةَ هِيَ الَّتِي تُزَوِّجُ نَفْسَهَا
অর্থ: “এক নারী অন্য নারীকে বিবাহ দিতে পারবে না, আর কোনো নারী নিজেও নিজের বিবাহ সম্পন্ন করতে পারবে না। কেননা ব্যভিচারিণী নারীই কেবল নিজেই নিজের বিবাহ দেয়।” [সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৮৮২; শায়খ আলবানি (রহ.) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন]
হানাফি মাজহাবে অভিভাবক ছাড়া প্রাপ্তবয়স্কা নারীর বিবাহ শুদ্ধ হওয়ার কথা বলা হলেও, আহলে হাদিস ও সালাফদের বিশুদ্ধ মানহাজ অনুযায়ী উপরের সহিহ হাদিসগুলোর ভিত্তিতে অভিভাবকহীন বিবাহ বাতিল বলে গণ্য হবে। যদি অভিভাবক ছাড়া এমন বিবাহ হয়েও যায়, তবে পরবর্তীতে অভিভাবক যদি সম্মতি দেন, তাহলে বিশুদ্ধ মতানুযায়ী নতুন করে মোহরানা নির্ধারণ করে সাক্ষীর উপস্থিতিতে পুনরায় শরয়ি আকদ করতে হবে।
পরিশেষে, পালিয়ে বিবাহ করার বিষয়টি শরীয়তে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও হারাম। কারণ পালিয়ে যাওয়ার জন্য ছেলে-মেয়ের মাঝে পূর্ব থেকেই অবৈধ যোগাযোগ, অবাধ মেলামেশা এবং হিজাবের বিধান লঙ্ঘন করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে, যা ইসলামে জিনার (ব্যভিচার) দরজা খুলে দেয়। একজন মুমিন নারী ও পুরুষের জন্য এমন ঘৃণ্য পথ অবলম্বন করা কখনোই বৈধ নয়। উপযুক্ত সময়ে অভিভাবকদের মাধ্যমে দ্বীনদার পাত্র-পাত্রী দেখে বিবাহ করাই ইসলামের সুন্দরতম বিধান।
দ্বীনের উপর স্থির থাকা বা 'ইস্তিকামাত' লাভ করা একজন মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় চাওয়া এবং সফলতার মূল চাবিকাঠি। সালাফে সালেহীনদের মানহাজ অনুযায়ী, ফিতনার এই যুগে দ্বীনের উপর অটল থাকতে হলে বেশ কয়েকটি মৌলিক বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া অতীব জরুরি। নিচে কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে বিষয়গুলো গুছিয়ে তুলRead more
দ্বীনের উপর স্থির থাকা বা ‘ইস্তিকামাত’ লাভ করা একজন মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় চাওয়া এবং সফলতার মূল চাবিকাঠি। সালাফে সালেহীনদের মানহাজ অনুযায়ী, ফিতনার এই যুগে দ্বীনের উপর অটল থাকতে হলে বেশ কয়েকটি মৌলিক বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া অতীব জরুরি। নিচে কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে বিষয়গুলো গুছিয়ে তুলে ধরা হলো:
১. তাওহীদকে আঁকড়ে ধরা এবং শিরক ও বিদআত বর্জন করা:
দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার প্রথম শর্ত হলো আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ ঈমান আনা এবং জীবনে কোনো প্রকার শিরক ও বিদআতের অনুপ্রবেশ ঘটতে না দেওয়া। যাবতীয় ইবাদত একমাত্র রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেখানো সহিহ তরিকা অনুযায়ী পালন করতে হবে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন:
إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنْتُمْ تُوعَدُونَ
অর্থ: “নিশ্চয়ই যারা বলে, আমাদের রব আল্লাহ, অতঃপর এর উপর অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় এবং বলে, তোমরা ভয় পেয়ো না, চিন্তিত হয়ো না এবং তোমাদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার সুসংবাদ গ্রহণ করো।” [সূরা ফুসসিলাত: ৩০]
২. ফরজ ইবাদত পালন ও নফল ইবাদত বৃদ্ধি করা:
নিষ্ঠার সাথে সকল ফরজ বিধানগুলো পালন করতে হবে। এর পাশাপাশি সাধ্য অনুযায়ী বেশি বেশি নফল ইবাদত করতে হবে। কারণ নফল ইবাদতের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে নৈকট্য লাভ করে।
হাদিসে কুদসিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ
অর্থ: “আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে, একপর্যায়ে আমি তাকে ভালোবাসতে শুরু করি।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৫০২]
৩. বেশি বেশি দোয়া করা:
অন্তরকে দ্বীনের উপর অটল রাখার মালিক একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা। তাই তাঁর কাছে সর্বদা দোয়া করতে হবে।
আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দোয়াটি খুব বেশি বেশি পড়তেন:
يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ
অর্থ: “হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের উপর অবিচল রাখুন।” [সুনান তিরমিজি, হাদিস: ২১৪০; আলবানি (রহ.) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন]
এছাড়াও কুরআনে বর্ণিত এই দোয়াটি বেশি বেশি পড়া উচিত:
رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ
অর্থ: “হে আমাদের রব! আপনি আমাদেরকে হিদায়াত দান করার পর আমাদের অন্তরসমূহকে বক্র করে দিবেন না এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদেরকে রহমত দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি মহাদাতা।” [সূরা আলে ইমরান: ৮]
৪. অন্তরকে সর্বদা আল্লাহর যিকিরে মশগুল রাখা:
যিকির অন্তরকে সজীব রাখে এবং শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে দূরে রাখে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
অর্থ: “জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।” [সূরা আর-রাদ: ২৮]
৫. আল্লাহর অবাধ্যতা ও গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা:
যেকোনো মূল্যে আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও সকল প্রকার পাপ কাজ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। কারণ গুনাহের কারণে অন্তর থেকে ঈমানের নূর কমে যায় এবং দ্বীনের উপর স্থির থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।
পরিশেষে, কোনো অবস্থাতেই আল্লাহর দ্বীন ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে দ্বীনের উপর ইস্তিকামাত নসিব করুন।
আযানের জবাব দেওয়া একটি অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ইবাদত। মুয়াজ্জিন যা বলেন, আযানের জবাবে শ্রোতারও হুবহু তা বলা সুন্নাহ। এর দলিল হলো আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত প্রসিদ্ধ হাদিস, যেখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন: إِذَا سَمِعْتُمُ النِّدَاءَ فَقُولُوا مِثْلَ مَRead more
আযানের জবাব দেওয়া একটি অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ইবাদত। মুয়াজ্জিন যা বলেন, আযানের জবাবে শ্রোতারও হুবহু তা বলা সুন্নাহ। এর দলিল হলো আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত প্রসিদ্ধ হাদিস, যেখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন:
إِذَا سَمِعْتُمُ النِّدَاءَ فَقُولُوا مِثْلَ مَا يَقُولُ الْمُؤَذِّنُ
অর্থ: “যখন তোমরা আযান শুনবে, তখন মুয়াজ্জিন যা বলে তোমরাও তার অনুরূপ বলবে।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১১ এবং সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩৮৩]
এই সহিহ হাদিসের ব্যাপকতার ভিত্তিতে, ফজরের আযানে মুয়াজ্জিন যখন “আস সালাতু খাইরুম মিনান নাউম” (ঘুমের চেয়ে সালাত উত্তম) বলবেন, তখন এর জবাবে শ্রোতাকেও হুবহু “আস সালাতু খাইরুম মিনান নাউম” বলতে হবে। আমাদের সমাজে অনেকেই এই বাক্যের জবাবে “সাদাকতা ওয়া বারারতা” বলে থাকেন। কিন্তু সালাফে সালেহীন ও মুহাদ্দিসীনদের মতে এই শব্দগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এর কোনো বিশুদ্ধ প্রমাণ নেই, তাই এটি বলা থেকে বিরত থাকতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ইকামতের জবাবের বিষয়টি। উলামায়ে কেরামের বিশুদ্ধ তাহকিক অনুযায়ী, ইকামতের আলাদা কোনো জবাব শরিয়তে সাব্যস্ত নেই।
ইকামতের সময় “ক্বাদ ক্বামাতিস সালাহ” এর জবাবে “আকামাহাল্লাহু ওয়া আদামাহা” বলার যে রেওয়ায়েতটি আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, মুহাদ্দিসীনদের সর্বসম্মত মত অনুযায়ী তা যয়িফ বা দুর্বল। শায়খ আলবানি (রহ.) সুনান আবু দাউদের (হাদিস নম্বর: ৫২৮) তাহকিকে এই বর্ণনাটিকে যয়িফ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
যেহেতু ইকামতের নির্দিষ্ট জবাবের বিষয়ে বর্ণিত হাদিসগুলো সনদের দিক থেকে দুর্বল এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে ইকামতের জবাব দেওয়ার কোনো সহিহ আমল প্রমাণিত নয়, তাই ইকামতের সময় চুপ থাকাই বিশুদ্ধ সুন্নাহ।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের সকলকে সহিহ সুন্নাহ জানার এবং তার উপর আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
যাকাত ইসলামের তৃতীয় রোকন এবং একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ইবাদত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা যাকাত ব্যয়ের ৮টি সুনির্দিষ্ট খাত বর্ণনা করেছেন। এই খাতগুলোর বাইরে অন্য কোথাও যাকাতের অর্থ ব্যয় করা শরিয়তসম্মত নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন: إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِRead more
যাকাত ইসলামের তৃতীয় রোকন এবং একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ইবাদত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা যাকাত ব্যয়ের ৮টি সুনির্দিষ্ট খাত বর্ণনা করেছেন। এই খাতগুলোর বাইরে অন্য কোথাও যাকাতের অর্থ ব্যয় করা শরিয়তসম্মত নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ فَرِيضَةً مِنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ
অর্থ: “নিশ্চয়ই সাদাকা (যাকাত) হচ্ছে ফকির, মিসকিন, যাকাত আদায়ের কাজে নিয়োজিত কর্মচারী, যাদের অন্তর আকৃষ্ট করা প্রয়োজন, দাস বা বন্দি মুক্তি, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি, আল্লাহর পথে (জিহাদে) এবং মুসাফিরের জন্য। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত ফরজ। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।” [সূরা আত-তাওবাহ: ৬০]
আয়াত অনুযায়ী যাকাতের ৮টি খাত হলো:
১. ফকির (দরিদ্র ব্যক্তি যার জীবনধারণের ন্যূনতম ব্যবস্থাও নেই)।
২. মিসকিন (অভাবগ্রস্ত ব্যক্তি, যার কিছু সম্পদ থাকলেও প্রয়োজন মেটানোর জন্য তা যথেষ্ট নয়)।
৩. যাকাত আদায়কারী কর্মচারী (যাদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে যাকাত আদায়, সংরক্ষণ ও বণ্টনের দায়িত্ব দেওয়া হয়)।
৪. মুয়াল্লাফাতুল কুলুব (যাদের অন্তর ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করা প্রয়োজন, যেমন নওমুসলিম)।
৫. দাস বা বন্দি মুক্তি।
৬. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি (যে হালাল প্রয়োজনে ঋণ করেছে কিন্তু পরিশোধে অক্ষম)।
৭. ফি সাবিলিল্লাহ বা আল্লাহর রাস্তায় (দ্বীনের বিজয়ের জন্য জিহাদরত মুজাহিদ)।
৮. মুসাফির (সফর অবস্থায় যে ব্যক্তি সম্পদহীন হয়ে পড়েছে)।
যাকাতের অর্থ এই আটটি খাতের যেকোনো একটিতে অথবা একাধিক খাতে প্রয়োজন অনুযায়ী বণ্টন করা যায়। তবে আরবি ব্যাকরণ অনুযায়ী আয়াতে প্রথম ৪টি খাতের শুরুতে ‘লাম’ (لِ) অক্ষর ব্যবহার করা হয়েছে, যা মালিকানা (তামলীক) বোঝায়। আর শেষের ৪টি খাতের শুরুতে ‘ফি’ (فِي) ব্যবহার করা হয়েছে, যা পাত্র বা ক্ষেত্র (যরফ) বোঝায়। এর মাধ্যমে শেষের খাতগুলোতে, বিশেষ করে ‘ফি সাবিলিল্লাহ’ বা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের ক্ষেত্রে যাকাত ব্যয়ের বিশালতা ও গুরুত্বকে আরও জোরালো করা হয়েছে।
যাকাত আদায় ও বণ্টনের মূল দায়িত্ব হলো ইসলামী রাষ্ট্রের। ইসলামী রাষ্ট্র জনগণের যাকাতযোগ্য সম্পদের হিসাব রাখবে এবং বছর পূর্ণ হলে তা সংগ্রহ করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সময়ের চাহিদানুযায়ী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে বণ্টন করবে। আর যাকাত সংগ্রহে নিয়োজিত কর্মচারীদের বেতন এই যাকাতের ফান্ড থেকেই দেওয়া হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুয়ায ইবনে জাবাল (রা.) কে ইয়েমেনে পাঠানোর সময় নির্দেশ দিয়েছিলেন:
تُؤْخَذُ مِنْ أَغْنِيَائِهِمْ فَتُرَدُّ عَلَى فُقَرَائِهِمْ
অর্থ: “তাদের ধনীদের কাছ থেকে যাকাত আদায় করা হবে এবং তাদের দরিদ্রদের মধ্যে তা ফিরিয়ে দেওয়া হবে।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩৯৫ এবং সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯]
যদি কেউ যাকাত দিতে অস্বীকার করে, তবে ইসলামী রাষ্ট্রের অধিকার রয়েছে তার থেকে জোরপূর্বক যাকাত আদায় করার এবং শাস্তিস্বরূপ তার সম্পদের একটি অংশ বাজেয়াপ্ত করার। মূল উত্তরে উমর (রা.) এর কথা বলা হলেও, এটি মূলত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুস্পষ্ট নির্দেশ।
হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
مَنْ أَعْطَاهَا مُؤْتَجِرًا فَلَهُ أَجْرُهَا وَمَنْ مَنَعَهَا فَإِنَّا آخِذُوهَا وَشَطْرَ مَالِهِ عَزْمَةً مِنْ عَزَمَاتِ رَبِّنَا عَزَّ وَجَلَّ
অর্থ: “যে ব্যক্তি সওয়াবের আশায় যাকাত আদায় করবে, সে তার প্রতিদান পাবে। আর যে তা দিতে অস্বীকৃতি জানাবে, আমরা তার কাছ থেকে তা জোরপূর্বক আদায় করব এবং সাথে তার অর্ধেক সম্পদও জরিমানা হিসেবে নিয়ে নেব। এটি আমাদের রবের অবশ্য পালনীয় নির্দেশাবলির একটি।” [সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ১৫৭৫; আলবানি (রহ.) হাদিসটিকে হাসান বলেছেন]
সুতরাং, যাকাত কোনো সাধারণ দান নয়, বরং এটি আল্লাহর ফরজ বিধান, যা নির্দিষ্ট খাতগুলোতেই অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আদায় করা অপরিহার্য। আল্লাহ তাআলা আমাদের সঠিকভাবে যাকাত আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
গবাদিপশুর স্বাভাবিক প্রজনন ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে ব্যাপক হারে কৃত্রিম প্রজনন পদ্ধতি গ্রহণ করা এবং এর জন্য ষাঁড়গুলোকে ঢালাওভাবে খাসি করে ফেলা শরিয়তের দৃষ্টিতে অপছন্দনীয় এবং অনুচিত কাজ। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা প্রতিটি প্রাণীর প্রজনন এবং বংশবৃদ্ধির জন্য একটি প্রাকৃতিক নিয়ম নির্ধারণ করেRead more
গবাদিপশুর স্বাভাবিক প্রজনন ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে ব্যাপক হারে কৃত্রিম প্রজনন পদ্ধতি গ্রহণ করা এবং এর জন্য ষাঁড়গুলোকে ঢালাওভাবে খাসি করে ফেলা শরিয়তের দৃষ্টিতে অপছন্দনীয় এবং অনুচিত কাজ।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা প্রতিটি প্রাণীর প্রজনন এবং বংশবৃদ্ধির জন্য একটি প্রাকৃতিক নিয়ম নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এই স্বাভাবিক নিয়মকে সম্পূর্ণ বদলে ফেলা শয়তানের প্ররোচনার একটি অংশ হতে পারে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা শয়তানের একটি চক্রান্তের কথা উল্লেখ করেছেন, যেখানে শয়তান বলেছিল:
وَلَآمُرَنَّهُمْ فَلَيُغَيِّرُنَّ خَلْقَ اللَّهِ
অর্থ: “এবং আমি অবশ্যই তাদেরকে নির্দেশ দেব, ফলে তারা আল্লাহর সৃষ্টিকে বিকৃত করবে।” [সূরা আন-নিসা: ১১৯]
যদিও অনেক ফকিহ গবাদিপশুর মাংস বা উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য নির্দিষ্ট প্রয়োজনে কৃত্রিম প্রজনন বা খাসি করাকে মুবাহ (বৈধ) বলেছেন, কিন্তু যখন এটি প্রাকৃতিক ধারাকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করার পর্যায়ে চলে যায় এবং এটিকে একমাত্র পন্থা হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তখন তা সৃষ্টির স্বাভাবিকতা নষ্ট করার পর্যায়ে পড়ে যায়। বিনা প্রয়োজনে ঢালাওভাবে প্রাণীদের প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট করা বা খাসি করা ইসলামে নিষেধ করা হয়েছে।
আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ إِخْصَاءِ الْخَيْلِ وَالْبَهَائِمِ
অর্থ: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোড়া এবং অন্যান্য চতুষ্পদ জন্তুকে খাসি (প্রজনন ক্ষমতাহীন) করতে নিষেধ করেছেন।” [মুসনাদ আহমাদ, হাদিস: ৬৩৮৩; আল্লামা শুয়াইব আরনাউত (রহ.) সনদটিকে শক্তিশালী বলেছেন]
আধুনিক যুগে অধিক মুনাফার আশায় গবাদিপশুর স্বাভাবিক প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট করে কেবল কৃত্রিম উপায়ের ওপর নির্ভর করার কারণে পশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমছে এবং খাবারে আগের মতো রহমত ও বরকত থাকছে না। আল্লাহর দেওয়া প্রাকৃতিক নিয়মের বাইরে গিয়ে মানুষ যখনই অপচেষ্টা চালিয়েছে, তখনই সমাজে ও প্রকৃতিতে নানা ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ لِيُذِيقَهُم بَعْضَ الَّذِي عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ
অর্থ: “মানুষের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে, যেন আল্লাহ তাদেরকে তাদের কিছু কর্মের শাস্তি আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে।” [সূরা আর-রূম: ৪১]
সারসংক্ষেপ হলো, আল্লাহর সৃষ্টিকে তার স্বাভাবিক অবস্থায় রাখা আমাদের দায়িত্ব। একান্ত বাধ্যগত কোনো পরিস্থিতি ছাড়া ঢালাওভাবে গবাদিপশুর স্বাভাবিক প্রজনন ব্যবস্থা বন্ধ করে কৃত্রিম প্রজনন পদ্ধতি গ্রহণ করা এবং সৃষ্টির ধারা পরিবর্তন করা থেকে নিজেদের দূরে রাখা উচিত। আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।
প্রশ্ন নং ৫০ ‣ পালিয়ে বিবাহ করা কি বৈধ?
ইসলামী শরীয়তে বিবাহের ক্ষেত্রে নারী এবং পুরুষের বিধানে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ নিজের বিবাহের আকদ নিজেই সম্পন্ন করতে পারে। কিন্তু কোনো নারী নিজে নিজের বিবাহ সম্পন্ন করতে পারে না। নারীর বিবাহের জন্য তার অভিভাবক (ওয়ালি) এর উপস্থিতি ও সম্মতি শর্ত। তাই ছেলে-মেয়ে শুধু নিজেরা রাRead more
ইসলামী শরীয়তে বিবাহের ক্ষেত্রে নারী এবং পুরুষের বিধানে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ নিজের বিবাহের আকদ নিজেই সম্পন্ন করতে পারে। কিন্তু কোনো নারী নিজে নিজের বিবাহ সম্পন্ন করতে পারে না। নারীর বিবাহের জন্য তার অভিভাবক (ওয়ালি) এর উপস্থিতি ও সম্মতি শর্ত। তাই ছেলে-মেয়ে শুধু নিজেরা রাজি থাকলে এবং সাক্ষী রাখলেই বিবাহ হয়ে যায়, এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল এবং সুন্নাহ পরিপন্থী।
See lessকুরআনুল কারীমে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পুরুষদেরকে সরাসরি বিবাহ করার নির্দেশ দিয়েছেন, কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে অভিভাবকদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন তাদের মেয়েদের বিবাহ দেওয়ার জন্য। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَنْكِحُوا الْمُشْرِكَاتِ حَتَّى يُؤْمِنَّ وَلَأَمَةٌ مُؤْمِنَةٌ خَيْرٌ مِنْ مُشْرِكَةٍ وَلَوْ أَعْجَبَتْكُمْ وَلَا تُنْكِحُوا الْمُشْرِكِينَ حَتَّى يُؤْمِنُوا وَلَعَبْدٌ مُؤْمِنٌ خَيْرٌ مِنْ مُشْرِكٍ وَلَوْ أَعْجَبَكُمْ
অর্থ: “আর মুমিন না হওয়া পর্যন্ত তোমরা মুশরিক নারীদের বিবাহ করো না। অবশ্যই একজন মুমিন দাসী একজন মুশরিক স্বাধীন নারীর চেয়ে উত্তম, যদিও সে তোমাদের মুগ্ধ করে। আর মুমিন না হওয়া পর্যন্ত মুশরিক পুরুষদের সাথে (তোমাদের নারীদের) বিবাহ দিয়ো না। অবশ্যই একজন মুমিন দাস একজন মুশরিক স্বাধীন পুরুষের চেয়ে উত্তম, যদিও সে তোমাদের মুগ্ধ করে।” [সূরা আল-বাকারাহ: ২২১]
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা পুরুষদের ক্ষেত্রে ‘লা তানকিহু’ (تَنْكِحُوا – তোমরা বিবাহ করো না) ব্যবহার করেছেন, যা নিজে বিবাহ করার নির্দেশ। কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে ‘লা তুনকিহু’ (تُنْكِحُوا – তোমরা বিবাহ দিয়ো না) ব্যবহার করেছেন, যার অর্থ অভিভাবকদের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তারা নারীদের বিবাহ দেয়।
সালাফে সালেহীন এবং জুমহুর (সংখ্যাগরিষ্ঠ) মুহাদ্দিসীনদের মত হলো, অভিভাবক ছাড়া নারীর বিবাহ সম্পূর্ণ বাতিল। এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ও সহিহ হাদিস রয়েছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
لاَ نِكَاحَ إِلاَّ بِوَلِيٍّ
অর্থ: “অভিভাবক (ওয়ালি) ছাড়া কোনো বিবাহ নেই।” [সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ২০৮৫; আলবানি (রহ.) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন]
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
أَيُّمَا امْرَأَةٍ نَكَحَتْ بِغَيْرِ إِذْنِ وَلِيِّهَا فَنِكَاحُهَا بَاطِلٌ فَنِكَاحُهَا بَاطِلٌ فَنِكَاحُهَا بَاطِلٌ
অর্থ: “যে নারী তার অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিবাহ করবে, তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল।” [সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ২০৮৩; জামে আত-তিরমিজি, হাদিস: ১১০২; আলবানি (রহ.) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন]
আর যে নারী নিজেই নিজের বিবাহ দেয়, তার ব্যাপারে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে অত্যন্ত কঠোর হুঁশিয়ারি এসেছে:
لَا تُزَوِّجُ الْمَرْأَةُ الْمَرْأَةَ وَلَا تُزَوِّجُ الْمَرْأَةُ نَفْسَهَا فَإِنَّ الزَّانِيَةَ هِيَ الَّتِي تُزَوِّجُ نَفْسَهَا
অর্থ: “এক নারী অন্য নারীকে বিবাহ দিতে পারবে না, আর কোনো নারী নিজেও নিজের বিবাহ সম্পন্ন করতে পারবে না। কেননা ব্যভিচারিণী নারীই কেবল নিজেই নিজের বিবাহ দেয়।” [সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৮৮২; শায়খ আলবানি (রহ.) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন]
হানাফি মাজহাবে অভিভাবক ছাড়া প্রাপ্তবয়স্কা নারীর বিবাহ শুদ্ধ হওয়ার কথা বলা হলেও, আহলে হাদিস ও সালাফদের বিশুদ্ধ মানহাজ অনুযায়ী উপরের সহিহ হাদিসগুলোর ভিত্তিতে অভিভাবকহীন বিবাহ বাতিল বলে গণ্য হবে। যদি অভিভাবক ছাড়া এমন বিবাহ হয়েও যায়, তবে পরবর্তীতে অভিভাবক যদি সম্মতি দেন, তাহলে বিশুদ্ধ মতানুযায়ী নতুন করে মোহরানা নির্ধারণ করে সাক্ষীর উপস্থিতিতে পুনরায় শরয়ি আকদ করতে হবে।
পরিশেষে, পালিয়ে বিবাহ করার বিষয়টি শরীয়তে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও হারাম। কারণ পালিয়ে যাওয়ার জন্য ছেলে-মেয়ের মাঝে পূর্ব থেকেই অবৈধ যোগাযোগ, অবাধ মেলামেশা এবং হিজাবের বিধান লঙ্ঘন করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে, যা ইসলামে জিনার (ব্যভিচার) দরজা খুলে দেয়। একজন মুমিন নারী ও পুরুষের জন্য এমন ঘৃণ্য পথ অবলম্বন করা কখনোই বৈধ নয়। উপযুক্ত সময়ে অভিভাবকদের মাধ্যমে দ্বীনদার পাত্র-পাত্রী দেখে বিবাহ করাই ইসলামের সুন্দরতম বিধান।
প্রশ্ন নং ৪৯ ‣ কীভাবে দ্বীনের উপর স্থির থাকা যায়?
দ্বীনের উপর স্থির থাকা বা 'ইস্তিকামাত' লাভ করা একজন মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় চাওয়া এবং সফলতার মূল চাবিকাঠি। সালাফে সালেহীনদের মানহাজ অনুযায়ী, ফিতনার এই যুগে দ্বীনের উপর অটল থাকতে হলে বেশ কয়েকটি মৌলিক বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া অতীব জরুরি। নিচে কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে বিষয়গুলো গুছিয়ে তুলRead more
দ্বীনের উপর স্থির থাকা বা ‘ইস্তিকামাত’ লাভ করা একজন মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় চাওয়া এবং সফলতার মূল চাবিকাঠি। সালাফে সালেহীনদের মানহাজ অনুযায়ী, ফিতনার এই যুগে দ্বীনের উপর অটল থাকতে হলে বেশ কয়েকটি মৌলিক বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া অতীব জরুরি। নিচে কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে বিষয়গুলো গুছিয়ে তুলে ধরা হলো:
See less১. তাওহীদকে আঁকড়ে ধরা এবং শিরক ও বিদআত বর্জন করা:
দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার প্রথম শর্ত হলো আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ ঈমান আনা এবং জীবনে কোনো প্রকার শিরক ও বিদআতের অনুপ্রবেশ ঘটতে না দেওয়া। যাবতীয় ইবাদত একমাত্র রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেখানো সহিহ তরিকা অনুযায়ী পালন করতে হবে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন:
إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنْتُمْ تُوعَدُونَ
অর্থ: “নিশ্চয়ই যারা বলে, আমাদের রব আল্লাহ, অতঃপর এর উপর অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় এবং বলে, তোমরা ভয় পেয়ো না, চিন্তিত হয়ো না এবং তোমাদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার সুসংবাদ গ্রহণ করো।” [সূরা ফুসসিলাত: ৩০]
২. ফরজ ইবাদত পালন ও নফল ইবাদত বৃদ্ধি করা:
নিষ্ঠার সাথে সকল ফরজ বিধানগুলো পালন করতে হবে। এর পাশাপাশি সাধ্য অনুযায়ী বেশি বেশি নফল ইবাদত করতে হবে। কারণ নফল ইবাদতের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে নৈকট্য লাভ করে।
হাদিসে কুদসিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ
অর্থ: “আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে, একপর্যায়ে আমি তাকে ভালোবাসতে শুরু করি।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৫০২]
৩. বেশি বেশি দোয়া করা:
অন্তরকে দ্বীনের উপর অটল রাখার মালিক একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা। তাই তাঁর কাছে সর্বদা দোয়া করতে হবে।
আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দোয়াটি খুব বেশি বেশি পড়তেন:
يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ
অর্থ: “হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের উপর অবিচল রাখুন।” [সুনান তিরমিজি, হাদিস: ২১৪০; আলবানি (রহ.) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন]
এছাড়াও কুরআনে বর্ণিত এই দোয়াটি বেশি বেশি পড়া উচিত:
رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ
অর্থ: “হে আমাদের রব! আপনি আমাদেরকে হিদায়াত দান করার পর আমাদের অন্তরসমূহকে বক্র করে দিবেন না এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদেরকে রহমত দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি মহাদাতা।” [সূরা আলে ইমরান: ৮]
৪. অন্তরকে সর্বদা আল্লাহর যিকিরে মশগুল রাখা:
যিকির অন্তরকে সজীব রাখে এবং শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে দূরে রাখে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
অর্থ: “জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।” [সূরা আর-রাদ: ২৮]
৫. আল্লাহর অবাধ্যতা ও গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা:
যেকোনো মূল্যে আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও সকল প্রকার পাপ কাজ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। কারণ গুনাহের কারণে অন্তর থেকে ঈমানের নূর কমে যায় এবং দ্বীনের উপর স্থির থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।
পরিশেষে, কোনো অবস্থাতেই আল্লাহর দ্বীন ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে দ্বীনের উপর ইস্তিকামাত নসিব করুন।
প্রশ্ন নং ৪৮ ‣ আস সালাতু খাইরুম মিনান নাউম এবং ইকামতের উত্তরে কি বলতে হয়?
আযানের জবাব দেওয়া একটি অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ইবাদত। মুয়াজ্জিন যা বলেন, আযানের জবাবে শ্রোতারও হুবহু তা বলা সুন্নাহ। এর দলিল হলো আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত প্রসিদ্ধ হাদিস, যেখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন: إِذَا سَمِعْتُمُ النِّدَاءَ فَقُولُوا مِثْلَ مَRead more
আযানের জবাব দেওয়া একটি অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ইবাদত। মুয়াজ্জিন যা বলেন, আযানের জবাবে শ্রোতারও হুবহু তা বলা সুন্নাহ। এর দলিল হলো আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত প্রসিদ্ধ হাদিস, যেখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন:
See lessإِذَا سَمِعْتُمُ النِّدَاءَ فَقُولُوا مِثْلَ مَا يَقُولُ الْمُؤَذِّنُ
অর্থ: “যখন তোমরা আযান শুনবে, তখন মুয়াজ্জিন যা বলে তোমরাও তার অনুরূপ বলবে।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১১ এবং সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩৮৩]
এই সহিহ হাদিসের ব্যাপকতার ভিত্তিতে, ফজরের আযানে মুয়াজ্জিন যখন “আস সালাতু খাইরুম মিনান নাউম” (ঘুমের চেয়ে সালাত উত্তম) বলবেন, তখন এর জবাবে শ্রোতাকেও হুবহু “আস সালাতু খাইরুম মিনান নাউম” বলতে হবে। আমাদের সমাজে অনেকেই এই বাক্যের জবাবে “সাদাকতা ওয়া বারারতা” বলে থাকেন। কিন্তু সালাফে সালেহীন ও মুহাদ্দিসীনদের মতে এই শব্দগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এর কোনো বিশুদ্ধ প্রমাণ নেই, তাই এটি বলা থেকে বিরত থাকতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ইকামতের জবাবের বিষয়টি। উলামায়ে কেরামের বিশুদ্ধ তাহকিক অনুযায়ী, ইকামতের আলাদা কোনো জবাব শরিয়তে সাব্যস্ত নেই।
ইকামতের সময় “ক্বাদ ক্বামাতিস সালাহ” এর জবাবে “আকামাহাল্লাহু ওয়া আদামাহা” বলার যে রেওয়ায়েতটি আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, মুহাদ্দিসীনদের সর্বসম্মত মত অনুযায়ী তা যয়িফ বা দুর্বল। শায়খ আলবানি (রহ.) সুনান আবু দাউদের (হাদিস নম্বর: ৫২৮) তাহকিকে এই বর্ণনাটিকে যয়িফ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
যেহেতু ইকামতের নির্দিষ্ট জবাবের বিষয়ে বর্ণিত হাদিসগুলো সনদের দিক থেকে দুর্বল এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে ইকামতের জবাব দেওয়ার কোনো সহিহ আমল প্রমাণিত নয়, তাই ইকামতের সময় চুপ থাকাই বিশুদ্ধ সুন্নাহ।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের সকলকে সহিহ সুন্নাহ জানার এবং তার উপর আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
প্রশ্ন নং ৪৭ ‣ যাকাতের খাত কয়টি ও কী কী?
যাকাত ইসলামের তৃতীয় রোকন এবং একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ইবাদত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা যাকাত ব্যয়ের ৮টি সুনির্দিষ্ট খাত বর্ণনা করেছেন। এই খাতগুলোর বাইরে অন্য কোথাও যাকাতের অর্থ ব্যয় করা শরিয়তসম্মত নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন: إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِRead more
যাকাত ইসলামের তৃতীয় রোকন এবং একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ইবাদত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা যাকাত ব্যয়ের ৮টি সুনির্দিষ্ট খাত বর্ণনা করেছেন। এই খাতগুলোর বাইরে অন্য কোথাও যাকাতের অর্থ ব্যয় করা শরিয়তসম্মত নয়।
See lessআল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ فَرِيضَةً مِنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ
অর্থ: “নিশ্চয়ই সাদাকা (যাকাত) হচ্ছে ফকির, মিসকিন, যাকাত আদায়ের কাজে নিয়োজিত কর্মচারী, যাদের অন্তর আকৃষ্ট করা প্রয়োজন, দাস বা বন্দি মুক্তি, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি, আল্লাহর পথে (জিহাদে) এবং মুসাফিরের জন্য। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত ফরজ। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।” [সূরা আত-তাওবাহ: ৬০]
আয়াত অনুযায়ী যাকাতের ৮টি খাত হলো:
১. ফকির (দরিদ্র ব্যক্তি যার জীবনধারণের ন্যূনতম ব্যবস্থাও নেই)।
২. মিসকিন (অভাবগ্রস্ত ব্যক্তি, যার কিছু সম্পদ থাকলেও প্রয়োজন মেটানোর জন্য তা যথেষ্ট নয়)।
৩. যাকাত আদায়কারী কর্মচারী (যাদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে যাকাত আদায়, সংরক্ষণ ও বণ্টনের দায়িত্ব দেওয়া হয়)।
৪. মুয়াল্লাফাতুল কুলুব (যাদের অন্তর ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করা প্রয়োজন, যেমন নওমুসলিম)।
৫. দাস বা বন্দি মুক্তি।
৬. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি (যে হালাল প্রয়োজনে ঋণ করেছে কিন্তু পরিশোধে অক্ষম)।
৭. ফি সাবিলিল্লাহ বা আল্লাহর রাস্তায় (দ্বীনের বিজয়ের জন্য জিহাদরত মুজাহিদ)।
৮. মুসাফির (সফর অবস্থায় যে ব্যক্তি সম্পদহীন হয়ে পড়েছে)।
যাকাতের অর্থ এই আটটি খাতের যেকোনো একটিতে অথবা একাধিক খাতে প্রয়োজন অনুযায়ী বণ্টন করা যায়। তবে আরবি ব্যাকরণ অনুযায়ী আয়াতে প্রথম ৪টি খাতের শুরুতে ‘লাম’ (لِ) অক্ষর ব্যবহার করা হয়েছে, যা মালিকানা (তামলীক) বোঝায়। আর শেষের ৪টি খাতের শুরুতে ‘ফি’ (فِي) ব্যবহার করা হয়েছে, যা পাত্র বা ক্ষেত্র (যরফ) বোঝায়। এর মাধ্যমে শেষের খাতগুলোতে, বিশেষ করে ‘ফি সাবিলিল্লাহ’ বা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের ক্ষেত্রে যাকাত ব্যয়ের বিশালতা ও গুরুত্বকে আরও জোরালো করা হয়েছে।
যাকাত আদায় ও বণ্টনের মূল দায়িত্ব হলো ইসলামী রাষ্ট্রের। ইসলামী রাষ্ট্র জনগণের যাকাতযোগ্য সম্পদের হিসাব রাখবে এবং বছর পূর্ণ হলে তা সংগ্রহ করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সময়ের চাহিদানুযায়ী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে বণ্টন করবে। আর যাকাত সংগ্রহে নিয়োজিত কর্মচারীদের বেতন এই যাকাতের ফান্ড থেকেই দেওয়া হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুয়ায ইবনে জাবাল (রা.) কে ইয়েমেনে পাঠানোর সময় নির্দেশ দিয়েছিলেন:
تُؤْخَذُ مِنْ أَغْنِيَائِهِمْ فَتُرَدُّ عَلَى فُقَرَائِهِمْ
অর্থ: “তাদের ধনীদের কাছ থেকে যাকাত আদায় করা হবে এবং তাদের দরিদ্রদের মধ্যে তা ফিরিয়ে দেওয়া হবে।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩৯৫ এবং সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯]
যদি কেউ যাকাত দিতে অস্বীকার করে, তবে ইসলামী রাষ্ট্রের অধিকার রয়েছে তার থেকে জোরপূর্বক যাকাত আদায় করার এবং শাস্তিস্বরূপ তার সম্পদের একটি অংশ বাজেয়াপ্ত করার। মূল উত্তরে উমর (রা.) এর কথা বলা হলেও, এটি মূলত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুস্পষ্ট নির্দেশ।
হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
مَنْ أَعْطَاهَا مُؤْتَجِرًا فَلَهُ أَجْرُهَا وَمَنْ مَنَعَهَا فَإِنَّا آخِذُوهَا وَشَطْرَ مَالِهِ عَزْمَةً مِنْ عَزَمَاتِ رَبِّنَا عَزَّ وَجَلَّ
অর্থ: “যে ব্যক্তি সওয়াবের আশায় যাকাত আদায় করবে, সে তার প্রতিদান পাবে। আর যে তা দিতে অস্বীকৃতি জানাবে, আমরা তার কাছ থেকে তা জোরপূর্বক আদায় করব এবং সাথে তার অর্ধেক সম্পদও জরিমানা হিসেবে নিয়ে নেব। এটি আমাদের রবের অবশ্য পালনীয় নির্দেশাবলির একটি।” [সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ১৫৭৫; আলবানি (রহ.) হাদিসটিকে হাসান বলেছেন]
সুতরাং, যাকাত কোনো সাধারণ দান নয়, বরং এটি আল্লাহর ফরজ বিধান, যা নির্দিষ্ট খাতগুলোতেই অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আদায় করা অপরিহার্য। আল্লাহ তাআলা আমাদের সঠিকভাবে যাকাত আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
প্রশ্ন নং ৪৬ ‣ গবাদিপশুর কৃত্রিম প্রজনন করা কতটুকু শরিয়তসম্মত?
গবাদিপশুর স্বাভাবিক প্রজনন ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে ব্যাপক হারে কৃত্রিম প্রজনন পদ্ধতি গ্রহণ করা এবং এর জন্য ষাঁড়গুলোকে ঢালাওভাবে খাসি করে ফেলা শরিয়তের দৃষ্টিতে অপছন্দনীয় এবং অনুচিত কাজ। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা প্রতিটি প্রাণীর প্রজনন এবং বংশবৃদ্ধির জন্য একটি প্রাকৃতিক নিয়ম নির্ধারণ করেRead more
গবাদিপশুর স্বাভাবিক প্রজনন ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে ব্যাপক হারে কৃত্রিম প্রজনন পদ্ধতি গ্রহণ করা এবং এর জন্য ষাঁড়গুলোকে ঢালাওভাবে খাসি করে ফেলা শরিয়তের দৃষ্টিতে অপছন্দনীয় এবং অনুচিত কাজ।
See lessআল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা প্রতিটি প্রাণীর প্রজনন এবং বংশবৃদ্ধির জন্য একটি প্রাকৃতিক নিয়ম নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এই স্বাভাবিক নিয়মকে সম্পূর্ণ বদলে ফেলা শয়তানের প্ররোচনার একটি অংশ হতে পারে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা শয়তানের একটি চক্রান্তের কথা উল্লেখ করেছেন, যেখানে শয়তান বলেছিল:
وَلَآمُرَنَّهُمْ فَلَيُغَيِّرُنَّ خَلْقَ اللَّهِ
অর্থ: “এবং আমি অবশ্যই তাদেরকে নির্দেশ দেব, ফলে তারা আল্লাহর সৃষ্টিকে বিকৃত করবে।” [সূরা আন-নিসা: ১১৯]
যদিও অনেক ফকিহ গবাদিপশুর মাংস বা উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য নির্দিষ্ট প্রয়োজনে কৃত্রিম প্রজনন বা খাসি করাকে মুবাহ (বৈধ) বলেছেন, কিন্তু যখন এটি প্রাকৃতিক ধারাকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করার পর্যায়ে চলে যায় এবং এটিকে একমাত্র পন্থা হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তখন তা সৃষ্টির স্বাভাবিকতা নষ্ট করার পর্যায়ে পড়ে যায়। বিনা প্রয়োজনে ঢালাওভাবে প্রাণীদের প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট করা বা খাসি করা ইসলামে নিষেধ করা হয়েছে।
আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ إِخْصَاءِ الْخَيْلِ وَالْبَهَائِمِ
অর্থ: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোড়া এবং অন্যান্য চতুষ্পদ জন্তুকে খাসি (প্রজনন ক্ষমতাহীন) করতে নিষেধ করেছেন।” [মুসনাদ আহমাদ, হাদিস: ৬৩৮৩; আল্লামা শুয়াইব আরনাউত (রহ.) সনদটিকে শক্তিশালী বলেছেন]
আধুনিক যুগে অধিক মুনাফার আশায় গবাদিপশুর স্বাভাবিক প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট করে কেবল কৃত্রিম উপায়ের ওপর নির্ভর করার কারণে পশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমছে এবং খাবারে আগের মতো রহমত ও বরকত থাকছে না। আল্লাহর দেওয়া প্রাকৃতিক নিয়মের বাইরে গিয়ে মানুষ যখনই অপচেষ্টা চালিয়েছে, তখনই সমাজে ও প্রকৃতিতে নানা ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ لِيُذِيقَهُم بَعْضَ الَّذِي عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ
অর্থ: “মানুষের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে, যেন আল্লাহ তাদেরকে তাদের কিছু কর্মের শাস্তি আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে।” [সূরা আর-রূম: ৪১]
সারসংক্ষেপ হলো, আল্লাহর সৃষ্টিকে তার স্বাভাবিক অবস্থায় রাখা আমাদের দায়িত্ব। একান্ত বাধ্যগত কোনো পরিস্থিতি ছাড়া ঢালাওভাবে গবাদিপশুর স্বাভাবিক প্রজনন ব্যবস্থা বন্ধ করে কৃত্রিম প্রজনন পদ্ধতি গ্রহণ করা এবং সৃষ্টির ধারা পরিবর্তন করা থেকে নিজেদের দূরে রাখা উচিত। আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।