প্রশ্নে উল্লেখিত পরিস্থিতির আলোকে ইসলামী শরীয়তের বিধান অত্যন্ত সুস্পষ্ট। এখানে স্ত্রীর পক্ষ থেকে দুটি মারাত্মক শরয়ি ত্রুটি ও অবাধ্যতা প্রকাশ পাচ্ছে। কুরআন, সহিহ সুন্নাহ এবং সালাফে সালেহীনদের বিশুদ্ধ মানহাজ অনুযায়ী এর সমাধান হলো: প্রথমত: সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে সন্তান দান করা বা না করRead more
প্রশ্নে উল্লেখিত পরিস্থিতির আলোকে ইসলামী শরীয়তের বিধান অত্যন্ত সুস্পষ্ট। এখানে স্ত্রীর পক্ষ থেকে দুটি মারাত্মক শরয়ি ত্রুটি ও অবাধ্যতা প্রকাশ পাচ্ছে। কুরআন, সহিহ সুন্নাহ এবং সালাফে সালেহীনদের বিশুদ্ধ মানহাজ অনুযায়ী এর সমাধান হলো:
প্রথমত: সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে
সন্তান দান করা বা না করা সম্পূর্ণ মহান আল্লাহর ইখতিয়ার। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন:
لِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ يَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ إِنَاثًا وَيَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ الذُّكُورَ
অর্থ: “আসমান ও জমিনের রাজত্ব একমাত্র আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যাসন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্রসন্তান দান করেন।” [সূরা আশ শুরা: ৪৯]
ইসলামে উপযুক্ত শরয়ি ওজর বা মায়ের জীবনের ঝুঁকির মতো চরম শারীরিক অক্ষমতা ছাড়া স্থায়ীভাবে জন্ম নিয়ন্ত্রণ করা বা আর কখনোই সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্পূর্ণ নাজায়েজ এবং ফিতরাত বিরোধী একটি কাজ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতকে বেশি বেশি সন্তান জন্মদানের নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি বলেছেন:
تَزَوَّجُوا الْوَدُودَ الْوَلُودَ إِنِّي مُكَاثِرٌ بِكُمُ الأَنْبِيَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
অর্থ: “তোমরা এমন নারীকে বিবাহ করো, যে বেশি প্রেমময়ী এবং অধিক সন্তান প্রসবকারিণী। কারণ কিয়ামতের দিন আমি অন্যান্য নবীদের সামনে তোমাদের আধিক্য নিয়ে গর্ব করব।” [সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ২০৫০; শায়খ আলবানি (রহ.) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন]
তাই আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর নিজের সিদ্ধান্তকে চাপিয়ে দেওয়া চরম আকিদাগত দুর্বলতা ও অজ্ঞতা। অনেক সম্পদশালী ব্যক্তি একটি সন্তান নিয়ে আর সন্তান নিতে চাননি, পরবর্তীতে দুর্ঘটনায় সেই সন্তান মারা যাওয়ার পর তারা সারাজীবন অনুশোচনা করেছেন। তাই এই স্ত্রীর উচিত নিজের ঈমান ও আকিদাহ পরিশুদ্ধ করা এবং আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট হওয়া।
দ্বিতীয়ত: স্বামীর ডাকে সাড়া না দেওয়া
কোনো স্ত্রীর জন্য শরয়ি ওজর (যেমন মাসিক, নেফাস বা চরম অসুস্থতা) ছাড়া স্বামীর ডাকে সাড়া না দেওয়া বা শারীরিক সম্পর্ক থেকে বিরত থাকা একটি কবিরা গুনাহ। এর ফলে সে আল্লাহর লানত ও ফেরেশতাদের অভিশাপের পাত্রী হয়।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
إِذَا دَعَا الرَّجُلُ امْرَأَتَهُ إِلَى فِرَاشِهِ فَأَبَتْ فَبَاتَ غَضْبَانَ عَلَيْهَا لَعَنَتْهَا الْمَلاَئِكَةُ حَتَّى تُصْبِحَ
অর্থ: “স্বামী যখন তার স্ত্রীকে বিছানায় ডাকে, আর স্ত্রী যদি তা অস্বীকার করে এবং স্বামী তার ওপর রাগ করে রাত কাটায়, তাহলে সকাল হওয়া পর্যন্ত ফেরেশতারা সেই স্ত্রীর ওপর অভিশাপ দিতে থাকে।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২৩৭ এবং সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪৩৬]
তৃতীয়ত: স্বামীর করণীয় এবং বহুবিবাহের সমাধান
দীর্ঘ ৮ বছর ধরে স্ত্রী যদি এমন আচরণ করে এবং অনুতপ্ত না হয়, তবে স্বামীর নিজের চরিত্র ও ঈমান হেফাজত করা ফরজ। একজন সক্ষম পুরুষের জন্য নিজের পবিত্রতা রক্ষার্থে এবং চোখের হিফাজতের জন্য একাধিক বিবাহ করা শরীয়তসম্মত ও উত্তম একটি সমাধান।
জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
إِذَا أَحَدُكُمْ أَعْجَبَتْهُ الْمَرْأَةُ فَوَقَعَتْ فِي قَلْبِهِ فَلْيَعْمِدْ إِلَى امْرَأَتِهِ فَلْيُوَاقِعْهَا فَإِنَّ ذَلِكَ يَرُدُّ مَا فِي نَفْسِهِ
অর্থ: “যদি তোমাদের কারো কোনো নারীর প্রতি দৃষ্টি পড়ে এবং তার প্রতি আকৃষ্ট হয়, তবে সে যেন তার স্ত্রীর কাছে যায় এবং তার সাথে মিলিত হয়। এটি তার অন্তরের কুমন্ত্রণা দূর করে দেবে।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪০৩]
এখন প্রথম স্ত্রী যদি মাসের পর মাস স্বামীর প্রয়োজন পূরণে অপারগ বা অবাধ্য হয়, তবে দ্বিতীয় স্ত্রী থাকলে স্বামী সহজেই নিজেকে হারাম থেকে বাঁচাতে পারে। সালাফে সালেহীনগণ সক্ষম পুরুষদের বিবাহের প্রতি উৎসাহ দিতেন। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) তার ছাত্র সাঈদ ইবনে জুবায়েরকে বলেছিলেন, “বিবাহ করো, কেননা এই উম্মতের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির (অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর) সবচেয়ে বেশি স্ত্রী ছিল।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৬৯]
চতুর্থত: স্ত্রীদের মাঝে সমতা বিধান এবং প্রথম স্ত্রীর আচরণ
যদি স্বামী দ্বিতীয় বিবাহ করেন, তবে প্রথম স্ত্রীর কোনো অধিকার নেই তাতে বাধা দেওয়া বা সতিনের তালাক দাবি করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
لاَ تَسْأَلِ الْمَرْأَةُ طَلاَقَ أُخْتِهَا لِتَسْتَفْرِغَ صَحْفَتَهَا
অর্থ: “কোনো নারী যেন তার (মুসলিম) বোনের তালাক দাবি না করে, যাতে তার পাত্রটি সে একাই শূন্য করে নিতে পারে। সে যেন বিবাহ বন্ধনে থাকে, কারণ তার তাকদিরে যা আছে সে তা পাবেই।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫১৫২]
তবে স্বামীকে অবশ্যই একাধিক স্ত্রীর মাঝে সময়, রাত্রীযাপন এবং ভরণপোষণের ক্ষেত্রে পূর্ণ ইনসাফ ও সমতা বজায় রাখতে হবে। এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল দায়িত্ব। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সতর্ক করে বলেছেন:
مَنْ كَانَتْ لَهُ امْرَأَتَانِ فَمَالَ إِلَى إِحْدَاهُمَا جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَشِقُّهُ مَائِلٌ
অর্থ: “যে ব্যক্তির দুজন স্ত্রী আছে কিন্তু সে তাদের একজনের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ল (অর্থাৎ বৈষম্য করল), সে কিয়ামতের দিন এমন অবস্থায় উঠবে যে তার শরীরের একাংশ অবশ বা ঝুলন্ত থাকবে।” [সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ২১৩৩; শায়খ আলবানি (রহ.) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন]
(অন্তরের ভালোবাসা মানুষের নিয়ন্ত্রণে নেই, তাই শুধুমাত্র বাহ্যিক এবং বৈষয়িক সমতা বিধানই স্বামীর ওপর ফরজ)।
সুতরাং উক্ত ভাইয়ের উচিত প্রথমে স্ত্রীকে কুরআন ও সুন্নাহর ভয় দেখিয়ে সংশোধন করার চেষ্টা করা। প্রয়োজনে দুই পরিবারের মুরব্বিদের নিয়ে শালিস করা। যদি স্ত্রী এরপরও অবাধ্যতায় অটল থাকে, তবে স্বামী নিজের চরিত্র রক্ষার্থে ইনসাফ করার সামর্থ্য সাপেক্ষে দ্বিতীয় বিবাহ করতে পারেন অথবা শরীয়তের নিয়ম অনুযায়ী তাকে তালাক দিয়ে একজন দ্বীনদার ও অনুগত নারীকে বিবাহ করতে পারেন। আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।
সন্তানকে দ্বীনের ওপর গড়ে তোলা এবং সালাতে অভ্যস্ত করা পিতা মাতার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। ইসলামী শরীয়তে ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে সালাতের জন্য নির্দেশ দেওয়ার সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: مُرُوا أَوْلَادَكُمْ بِالصَّلَاةِ وَهُمْ أَبْنَاءُ سَبْعِ سِنِينَ، وَRead more
সন্তানকে দ্বীনের ওপর গড়ে তোলা এবং সালাতে অভ্যস্ত করা পিতা মাতার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। ইসলামী শরীয়তে ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে সালাতের জন্য নির্দেশ দেওয়ার সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
مُرُوا أَوْلَادَكُمْ بِالصَّلَاةِ وَهُمْ أَبْنَاءُ سَبْعِ سِنِينَ، وَاضْرِبُوهُمْ عَلَيْهَا، وَهُمْ أَبْنَاءُ عَشْرٍ
অর্থ: “তোমাদের সন্তানদের বয়স সাত বছর হলে তাদেরকে সালাতের নির্দেশ দাও। আর যখন তাদের বয়স দশ বছর হয়, তখন সালাত আদায় না করলে তাদেরকে প্রহার করো (শাসন করো)।” [সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৫; শায়খ আলবানি (রহ.) হাদিসটিকে হাসান সহিহ বলেছেন]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এই সুন্নাহ অনুযায়ী সন্তানকে শৈশব থেকেই গড়ে তুললে, পরবর্তীতে তাদের সালাতে অমনোযোগী বা বেনামাজি হওয়ার আশঙ্কা খুবই কম থাকে।
তবে এরপরও যদি কোনো সন্তান সালাতে অবহেলা করে এবং বারবার বোঝানোর পরও জামাতের সাথে সালাত আদায় না করে, তবে পিতার দায়িত্ব হলো হাল না ছেড়ে দিয়ে ধারাবাহিকভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। কারণ পিতা হলেন তার পরিবারের দায়িত্বশীল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
الرَّجُلُ رَاعٍ فِي أَهْلِهِ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ
অর্থ: “পুরুষ তার পরিবারের অভিভাবক, এবং তাকে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত করা হবে।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৯৩]
এ অবস্থায় পিতার করণীয় বিষয়গুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. নসিহত ও আখিরাতের ভয় প্রদর্শন: সন্তানকে জাহান্নামের আজাব এবং সালাত তরক করার ভয়াবহ পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দিতে হবে। আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا
অর্থ: “হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও।” [সূরা আত-তাহরীম: ৬]
২. সম্পর্ক ছিন্ন না করে হিকমাহর সাথে শাসন: সালাফে সালেহীন এবং সমসাময়িক উলামায়ে কেরাম (যেমন শায়খ ইবনে বাজ ও শায়খ ইবনে উসাইমিন রহ.) এর ফতোয়া অনুযায়ী, সন্তান বেনামাজি হলে তার সাথে তখনই সম্পর্ক ছিন্ন করা (হাজর করা) উচিত নয়, যদি সম্পর্ক ছিন্ন করলে সে আরও বেশি অবাধ্য বা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বরং তাকে কাছে রেখে, বুঝিয়ে এবং হিকমাহর সাথে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। শরীয়তে সম্পর্ক ছিন্ন করার মূল উদ্দেশ্য হলো সংশোধন করা, যদি তা বৃহত্তর ক্ষতির কারণ হয় তবে তা সাময়িকভাবে পরিহার করে নসিহত চালিয়ে যেতে হবে।
৩. অবিরাম দোয়া করা: পিতা মাতার দোয়া সন্তানের জন্য অত্যন্ত কার্যকর এবং তা দ্রুত কবুল হয়। সন্তানের হিদায়াতের জন্য আল্লাহর কাছে বেশি বেশি কান্নাকাটি করে দোয়া করতে হবে। বিশেষ করে রাতের শেষ ভাগে তাহাজ্জুদের সালাতে সিজদাহরত অবস্থায় দোয়া করা উত্তম।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
أَقْرَبُ مَا يَكُونُ الْعَبْدُ مِنْ رَبِّهِ وَهُوَ سَاجِدٌ فَأَكْثِرُوا الدُّعَاءَ
অর্থ: “বান্দা তার রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী হয় যখন সে সিজদাহরত থাকে। সুতরাং তোমরা তখন বেশি বেশি দোয়া করো।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৮২]
এছাড়াও কুরআনে বর্ণিত এই দোয়াটি বেশি বেশি পড়া উচিত:
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
অর্থ: “হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের পক্ষ থেকে আমাদের জন্য চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদেরকে মুত্তাকিদের জন্য আদর্শ বানিয়ে দিন।” [সূরা আল-ফুরকান: ৭৪]
পিতা হিসেবে আপনার দায়িত্ব হলো ধৈর্য ধারণ করে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। হিদায়াত দেওয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ। এভাবে নিরলস চেষ্টা ও দোয়া অব্যাহত রাখলে আশা করা যায় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাকে দ্বীনের প্রতি অনুরাগী করবেন। আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।
জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ ইসলামের অন্যতম একটি সর্বোচ্চ ইবাদত। শরীয়তের বিধান অনুযায়ী, সাধারণ অবস্থায় জিহাদ হলো 'ফরজে কিফায়া' বা সামষ্টিক ফরজ। অর্থাৎ, মুসলিমদের মধ্য থেকে একটি দল বা অংশ যদি জিহাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে আঞ্জাম দেন, তবে বাকিদের ওপর থেকে এর বাধ্যবাধকতা রহিত হয়ে যাবে। কিন্তু যদি কেউই এই দাযRead more
জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ ইসলামের অন্যতম একটি সর্বোচ্চ ইবাদত। শরীয়তের বিধান অনুযায়ী, সাধারণ অবস্থায় জিহাদ হলো ‘ফরজে কিফায়া’ বা সামষ্টিক ফরজ। অর্থাৎ, মুসলিমদের মধ্য থেকে একটি দল বা অংশ যদি জিহাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে আঞ্জাম দেন, তবে বাকিদের ওপর থেকে এর বাধ্যবাধকতা রহিত হয়ে যাবে। কিন্তু যদি কেউই এই দায়িত্ব পালন না করে, তবে সক্ষম সকল মুসলিমই ফরজ লঙ্ঘনের কারণে গুনাহগার হবে।
তবে সালাফে সালেহীন এবং জুমহুর ফুকাহায়ে কেরামের ঐকমত্যে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট অবস্থায় জিহাদ প্রত্যেক সক্ষম মুসলিমের ওপর ‘ফরজে আইন’ বা ব্যক্তিগত ফরজ হয়ে যায়। এই অবস্থাগুলো কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে আলোচনা করা হলো:
১. মুসলিম ভূখণ্ড আক্রান্ত হলে:
কোনো মুসলিম ভূখণ্ড যদি কাফির বা শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হয়, তখন সেই ভূখণ্ড এবং নিজেদের জান, মাল ও দ্বীন রক্ষা করা ঐ অঞ্চলের সকল মুসলিমের ওপর ফরজে আইন হয়ে যায়। ইসলামী ফিকহে একে ‘দাফউস সায়িল’ বা আক্রমণকারীকে প্রতিহত করা বলা হয়। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) এ বিষয়ে বলেন, “আক্রমণকারী শত্রুকে প্রতিহত করার চেয়ে ঈমানের পর অন্য কোনো ফরজ অধিক গুরুত্বপূর্ণ নয়।” [আল ফাতাওয়া আল কুবরা]
যদি ঐ অঞ্চলের মুসলিমরা তাদের ভূমি রক্ষা করতে সক্ষম না হন, তবে তাদের নিকটবর্তী পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মুসলিমদের ওপরও জিহাদ ফরজে আইন হয়। তারাও সক্ষম না হলে তাদের নিকটবর্তী অঞ্চলের ওপর ফরজ হয়। এভাবে পর্যায়ক্রমে শত্রুকে প্রতিহত করা পর্যন্ত সারা বিশ্বের মুসলিমদের ওপর এটি ফরজে আইন হিসেবে বর্তায়।
২. দখলকৃত ভূমি উদ্ধার করার ক্ষেত্রে:
শত্রুর কবল থেকে দখলকৃত মুসলিম ভূমি উদ্ধার করার জন্যও জিহাদ ফরজে আইন। যতদিন পর্যন্ত না সেই ভূমি সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত হয়, এই ফরজ দায়িত্ব পর্যায়ক্রমে মুসলিম উম্মাহর ওপর বহাল থাকে।
৩. নির্যাতিত মুসলিমদের সাহায্যার্থে:
যদি কোনো মুসলিম ভাই বোনেরা শত্রু কর্তৃক নির্যাতিত হয়ে অন্য মুসলিমদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে, তখন তাদেরকে উদ্ধার করা নিকটবর্তী মুসলিমদের ওপর ফরজে আইন হয়ে যায়। তারা সক্ষম না হলে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য মুসলিমদের ওপর তা ফরজ হয়।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পবিত্র কুরআনে মুমিনদেরকে এই নির্দেশ দিয়ে বলেন:
وَمَا لَكُمْ لَا تُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالْمُسْتَضْعَفِينَ مِنَ الرِّجَالِ وَالنِّسَاءِ وَالْوِلْدَانِ
অর্থ: “তোমাদের কী হলো যে, তোমরা আল্লাহর পথে এবং অসহায় নরনারী ও শিশুদের রক্ষার্থে যুদ্ধ করছ না?” [সূরা আন-নিসা: ৭৫]
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِنِ اسْتَنْصَرُوكُمْ فِي الدِّينِ فَعَلَيْكُمُ النَّصْرُ
অর্থ: “তবে তারা যদি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের কাছে সাহায্য চায়, তবে তাদেরকে সাহায্য করা তোমাদের কর্তব্য।” [সূরা আল-আনফাল: ৭২]
উম্মাহর এই পারস্পরিক দায়িত্ববোধের বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন:
مَثَلُ الْمُؤْمِنِينَ فِي تَوَادِّهِمْ وَتَرَاحُمِهِمْ وَتَعَاطُفِهِمْ مَثَلُ الْجَسَدِ إِذَا اشْتَكَى مِنْهُ عُضْوٌ تَدَاعَى لَهُ سَائِرُ الْجَسَدِ بِالسَّهَرِ وَالْحُمَّى
অর্থ: “মুমিনদের পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া ও সহানুভূতির দৃষ্টান্ত একটি দেহের ন্যায়। যখন তার কোনো একটি অঙ্গ আক্রান্ত হয়, তখন গোটা দেহ জ্বর ও অনিদ্রায় ভুগে।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৬]
যে অবস্থায় জিহাদ ফরজে কিফায়া থাকে, তখনও প্রতিটি মুসলিমকে অন্তরে জিহাদের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতে হবে। অন্যথায় হাদিসের ভাষ্যমতে তার মাঝে মুনাফেকির শাখা থেকে যায়। আর জিহাদ যে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত একটি মহান ফরজ ইবাদত, এই দৃঢ় বিশ্বাস অন্তরে ধারণ করা সকল সক্ষম মুসলিমের জন্য অপরিহার্য। যারা জিহাদকে ফরজ ইবাদত হিসেবে স্বীকার করে না বা অস্বীকার করে, তারা আল্লাহর একটি অকাট্য বিধান লঙ্ঘনের কারণে ভয়াবহ অপরাধী হিসেবে পরিগণিত হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করুন। আমিন।
যেকোনো অ্যাপ (যেমন: সেলফ অ্যাপ) বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অনলাইনে কাজ করে অর্থ উপার্জন করাটা মূলত কাজের ধরনের ওপর নির্ভর করে। ইসলামী শরীয়তের একটি সুপরিচিত ফিকহি মূলনীতি হলো, মুয়ামালাত বা লেনদেনের ক্ষেত্রে মূল বিধান হলো তা মুবাহ বা বৈধ, যতক্ষণ না তা হারাম হওয়ার সুস্পষ্ট কোনো কারণ পাওয়া যায়। তাই সেলRead more
যেকোনো অ্যাপ (যেমন: সেলফ অ্যাপ) বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অনলাইনে কাজ করে অর্থ উপার্জন করাটা মূলত কাজের ধরনের ওপর নির্ভর করে। ইসলামী শরীয়তের একটি সুপরিচিত ফিকহি মূলনীতি হলো, মুয়ামালাত বা লেনদেনের ক্ষেত্রে মূল বিধান হলো তা মুবাহ বা বৈধ, যতক্ষণ না তা হারাম হওয়ার সুস্পষ্ট কোনো কারণ পাওয়া যায়।
তাই সেলফ অ্যাপ বা এই জাতীয় প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আপনার পার্ট টাইম কাজ ও ইনকাম হালাল হওয়ার জন্য নিম্নের শর্তগুলো পূরণ হওয়া আবশ্যক:
১. কাজের ধরন হালাল হওয়া: আপনি অ্যাপটিতে যে কাজটি করবেন (যেমন: রিসেলিং, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং বা প্রমোশন), তা শরীয়তসম্মত হতে হবে। যদি সেখানে কোনো হারাম পণ্য (যেমন: গানবাদ্য, অশ্লীলতা, হারাম বা ক্ষতিকর কোনো বস্তু) বিক্রি বা প্রমোশন করতে হয়, তবে তা থেকে অর্জিত আয় হারাম হবে।
২. হারাম কাজে সহযোগিতা না করা: কোনো হারাম পণ্যের প্রচারে বা অবৈধ কাজে পরোক্ষভাবেও সহযোগিতা করা যাবে না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন:
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
অর্থ: “সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পরের সাহায্য করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অন্যের সাহায্য করো না।” [সূরা আল-মায়েদাহ: ২]
৩. ধোঁকা বা গারার না থাকা: কাজের বিবরণ, পারিশ্রমিক এবং লেনদেন একদম সুস্পষ্ট হতে হবে। এতে কোনো ধরনের ধোঁকা, প্রতারণা বা অস্পষ্টতা (গারার) থাকা যাবে না। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
مَنْ غَشَّ فَلَيْسَ مِنِّي
অর্থ: “যে প্রতারণা করে, সে আমার দলভুক্ত নয়।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১]
৪. এমএলএম (MLM) বা পিরামিড স্কিম না হওয়া: অ্যাপটির আয়ের উৎস যদি এমন হয় যে, শুধু টাকার বিনিময়ে নতুন সদস্য যুক্ত করার মাধ্যমেই কমিশন পাওয়া যায় (যেখানে বাস্তব ও হালাল কোনো পণ্যের স্বাভাবিক লেনদেন মূল উদ্দেশ্য নয়), তবে তা মাল্টি লেভেল মার্কেটিং বা এমএলএম এর অন্তর্ভুক্ত হবে, যা অধিকাংশ সালাফি উলামায়ে কেরাম এবং ইসলামিক ফিকহ একাডেমির বিশুদ্ধ ফতোয়া অনুযায়ী নাজায়েজ।
তবে যদি এটি সরাসরি শরীয়তসম্মত পণ্যের রিসেলিং হয় এবং হালাল পণ্য বিক্রয়ের ওপর আপনাকে একটি নির্দিষ্ট কমিশন দেওয়া হয়, তবে তা ইসলামে ‘দালালি’ বা ব্রোকারেজ হিসেবে গণ্য হবে, যা শর্তসাপেক্ষে জায়েজ।
সারসংক্ষেপ হলো,অ্যাপটির আয়ের মাধ্যম, কাজের প্রকৃতি এবং লেনদেন যদি সম্পূর্ণ বৈধ হয় এবং হারাম কোনো কাজের সাথে সম্পৃক্ততা না থাকে, তবে সেখান থেকে ইনকাম করা হালাল হবে। আর যদি তাতে হারাম বা প্রতারণার কোনো সংমিশ্রণ থাকে, তবে তা বর্জন করা একজন মুমিনের জন্য অপরিহার্য। আল্লাহ তাআলা আমাদের হালাল রিজিক অন্বেষণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
আপনার প্রশ্নে মূলত দুটি ভিন্ন বিষয় রয়েছে। প্রথম অংশ: একসাথে তিন তালাক দেওয়ার বিধান ইসলামী শরীয়তে একসাথে একই মজলিসে তিন তালাক দেওয়া বিদআত এবং এটি একটি হারাম কাজ। কেউ যদি অজ্ঞতাবশত বা রাগের বশবর্তী হয়ে এমনটি করে, তবে বিশুদ্ধ মত এবং সালাফি উলামায়ে কেরামের ফতোয়া অনুযায়ী তা এক তালাক বা 'তালাকে রRead more
আপনার প্রশ্নে মূলত দুটি ভিন্ন বিষয় রয়েছে।
প্রথম অংশ: একসাথে তিন তালাক দেওয়ার বিধান
ইসলামী শরীয়তে একসাথে একই মজলিসে তিন তালাক দেওয়া বিদআত এবং এটি একটি হারাম কাজ। কেউ যদি অজ্ঞতাবশত বা রাগের বশবর্তী হয়ে এমনটি করে, তবে বিশুদ্ধ মত এবং সালাফি উলামায়ে কেরামের ফতোয়া অনুযায়ী তা এক তালাক বা ‘তালাকে রাজয়ী’ (প্রত্যাহারযোগ্য তালাক) হিসেবে গণ্য হবে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে একসাথে তিন তালাক দেওয়াকে অত্যন্ত গর্হিত কাজ মনে করা হতো। মাহমুদ ইবনে লাবীদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
أُخْبِرَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ رَجُلٍ طَلَّقَ امْرَأَتَهُ ثَلَاثَ تَطْلِيقَاتٍ جَمِيعًا فَقَامَ غَضْبَانًا ثُمَّ قَالَ أَيُلْعَبُ بِكِتَابِ اللَّهِ وَأَنَا بَيْنَ أَظْهُرِكُمْ
অর্থ: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এমন এক ব্যক্তি সম্পর্কে জানানো হলো, যে তার স্ত্রীকে একসাথে তিন তালাক দিয়েছে। তখন তিনি রাগান্বিত হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং বললেন, আমি তোমাদের মাঝে জীবিত থাকতেই কি আল্লাহর কিতাব নিয়ে খেলা করা হচ্ছে? এমনকি এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি কি তাকে হত্যা করব?” [সুনান আন-নাসায়ী, হাদিস: ৩৪০১; শায়খ আলবানি (রহ.) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন]
একসাথে দেওয়া তিন তালাক যে এক তালাক হিসেবেই গণ্য হয়, তার অকাট্য দলিল হলো আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) এর হাদিস। তিনি বলেন:
كَانَ الطَّلاَقُ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَأَبِي بَكْرٍ وَسَنَتَيْنِ مِنْ خِلاَفَةِ عُمَرَ طَلاَقُ الثَّلاَثِ وَاحِدَةً
অর্থ: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে, আবু বকর (রা.) এর যুগে এবং উমর (রা.) এর খিলাফাতের প্রথম দুই বছর পর্যন্ত একসাথে দেওয়া তিন তালাক এক তালাক হিসেবেই গণ্য হতো।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪৭২]
পরবর্তীতে মানুষ যখন এই ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন শুরু করল এবং একসাথে তিন তালাক দেওয়ার প্রবণতা বাড়িয়ে দিল, তখন খলিফা উমর (রা.) মানুষের জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা (তাযির) হিসেবে এটিকে তিন তালাক হিসেবে প্রয়োগ করার প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে শরিয়তের মূল বিধান হলো এটি এক তালাক হিসেবেই ধর্তব্য হবে। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.), ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) সহ সমসাময়িক অধিকাংশ বড় উলামায়ে কেরামের ফতোয়া এটিই।
সুন্নাহসম্মত তালাকের পদ্ধতি:
তালাক দেওয়ার সুন্নাহ পদ্ধতি হলো, স্ত্রীর এমন পবিত্র অবস্থায় (তুহুর) তাকে কেবল এক তালাক দেওয়া, যে পবিত্র অবস্থায় স্বামীর সাথে তার কোনো শারীরিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়নি। এরপর স্ত্রী তার স্বামীর বাড়িতেই ইদ্দত পালন করবে। ইদ্দত হলো স্ত্রীর তিনটি মাসিক ঋতুস্রাব (পিরিয়ড) পার হওয়া। এই ইদ্দত চলাকালীন যেকোনো সময় স্বামী চাইলে স্ত্রীকে মৌখিক বা শারীরিকভাবে ফিরিয়ে নিতে (রুজু করতে) পারবে।
যদি ইদ্দত শেষ হয়ে যায় এবং স্বামী রুজু না করে, তবে স্ত্রী ‘বাইন’ তালাকপ্রাপ্তা হয়ে যাবে। তখন সে মুক্ত এবং চাইলে অন্য কাউকে বিবাহ করতে পারবে। আর যদি প্রথম স্বামী-স্ত্রী উভয়ে আবার একসাথে সংসার করতে রাজি হয়, তবে তারা নতুন করে মোহরানা নির্ধারণ করে পুনরায় বিবাহ (আকদ) করতে পারবে।
কিন্তু স্বামী যদি তিন ধাপে (আলাদা আলাদা তিনটি পবিত্র অবস্থায়) তিনবার তালাক দেয়, তবে স্ত্রী চিরতরে হারাম হয়ে যাবে (তালাকে মুগাল্লাযাহ)। এরপর সে স্ত্রী অন্য কোথাও স্বাভাবিকভাবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যদি কখনো স্বামী মারা যায় বা তালাকপ্রাপ্ত হয়, কেবল তখনই সে পূর্বের স্বামীর জন্য হালাল হতে পারে। পূর্বপরিকল্পিত চুক্তিভিত্তিক বিবাহ বা ‘হালালা’ শরীয়তে সম্পূর্ণ হারাম এবং অভিশপ্ত।
দ্বিতীয় অংশ: রাগ করে বাবার বাড়ি যেতে বলা
ইসলামী ফিকহ অনুযায়ী, রাগ করে স্ত্রীকে “বাবার বাড়ি চলে যাও” বা “তোমার পরিবারের কাছে ফিরে যাও” বলাটা তালাকের সুস্পষ্ট শব্দ (সরিহ) নয়, বরং এটি তালাকের ইঙ্গিতবহ শব্দ (কিনায়াহ)।
ইঙ্গিতবহ শব্দ দ্বারা তালাক পতিত হওয়া বা না হওয়া সম্পূর্ণ নির্ভর করে স্বামীর নিয়তের ওপর।
১. স্বামী যদি “বাবার বাড়ি চলে যাও” বলার সময় মনে মনে তালাক দেওয়ার নিয়ত করে থাকে, তবে এক তালাক (রাজয়ী) পতিত হবে।
২. আর যদি সে তালাকের নিয়ত না করে কেবল রাগ সামলাতে, ধমক দিতে বা কিছুদিনের জন্য তাকে বাবার বাড়িতে পাঠাতে চেয়ে এই কথা বলে থাকে, তবে এর দ্বারা কোনো তালাক হবে না।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কাব ইবনে মালিক (রা.) কে তার স্ত্রীর কাছ থেকে সাময়িক আলাদা থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন, তখন কাব (রা.) জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আমি কি তাকে তালাক দেব?” নবীজি বললেন, “না, তুমি কেবল তার থেকে আলাদা থাকো।” তখন কাব (রা.) তার স্ত্রীকে বলেছিলেন, “الحقي بأهلك” (তুমি তোমার পরিবারের কাছে চলে যাও)। যেহেতু কাব (রা.) এর তালাকের নিয়ত ছিল না, তাই সেখানে কোনো তালাক পতিত হয়নি। [সহিহ বুখারি ও মুসলিম]
সুতরাং, এ ক্ষেত্রে স্বামীর নিয়ত কী ছিল, তার ভিত্তিতেই ফয়সালা হবে। আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।
হেঁটে হেঁটে মিসওয়াক করা ইসলামী শরীয়তে সম্পূর্ণ জায়েজ। ইসলামী ফিকহের একটি সুপরিচিত ও সর্বসম্মত মূলনীতি হলো "আল আসলু ফিল আশয়া আল ইবাহাহ" অর্থাৎ, ইবাদত ব্যতীত দুনিয়াবী বা সাধারণ যেকোনো কাজ ও বস্তুর ক্ষেত্রে মূল বিধান হলো তা মুবাহ বা বৈধ, যতক্ষণ না তা হারাম বা নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে কুরআন বা সুন্নRead more
হেঁটে হেঁটে মিসওয়াক করা ইসলামী শরীয়তে সম্পূর্ণ জায়েজ। ইসলামী ফিকহের একটি সুপরিচিত ও সর্বসম্মত মূলনীতি হলো “আল আসলু ফিল আশয়া আল ইবাহাহ” অর্থাৎ, ইবাদত ব্যতীত দুনিয়াবী বা সাধারণ যেকোনো কাজ ও বস্তুর ক্ষেত্রে মূল বিধান হলো তা মুবাহ বা বৈধ, যতক্ষণ না তা হারাম বা নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে কুরআন বা সুন্নাহর কোনো সুস্পষ্ট দলিল পাওয়া যায়। হেঁটে হেঁটে মিসওয়াক করা নিষেধ হওয়ার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বা সাহাবায়ে কেরাম থেকে কোনো সহিহ দলিল তো দূরের কথা, কোনো যয়িফ (দুর্বল) হাদিসও বর্ণিত হয়নি।
মিসওয়াক করা একটি অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ সুন্নাহ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদাই মিসওয়াক করতে ভালোবাসতেন এবং উম্মতকে এর প্রতি ব্যাপকভাবে উদ্বুদ্ধ করেছেন।
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
السِّوَاكُ مَطْهَرَةٌ لِلْفَمِ مَرْضَاةٌ لِلرَّبِّ
অর্থ: “মিসওয়াক হলো মুখমণ্ডল পবিত্র করার মাধ্যম এবং রবের সন্তুষ্টি অর্জনের উপায়।” [সুনান আন-নাসায়ী, হাদিস: ৫; শায়খ আলবানি (রহ.) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন]
আমাদের সমাজে বা কিছু মানুষের মুখে এমন কথা প্রচলিত আছে যে, হেঁটে হেঁটে মিসওয়াক করলে শারীরিক ক্ষতি হয় বা এটি অনুচিত। কিন্তু সালাফে সালেহীন ও নির্ভরযোগ্য উলামায়ে কেরামের ফতোয়া অনুযায়ী, এর কোনো শরয়ি বা সুনিশ্চিত চিকিৎসাবিজ্ঞানগত ভিত্তি নেই। এটি নিছক একটি ভিত্তিহীন ধারণা।
সুতরাং, কেউ যদি সময় বাঁচানোর জন্য বা স্বাভাবিকভাবে পথে চলতে চলতে বা হেঁটে হেঁটে মিসওয়াক করেন, তবে তাতে শরিয়তের দৃষ্টিতে বিন্দুমাত্র কোনো সমস্যা বা গুনাহ নেই। এর কারণে মিসওয়াকের সুন্নাহর সওয়াব থেকেও বঞ্চিত হতে হবে না। আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।
ইসলামী শরীয়তে প্রাণীর আকৃতিবিশিষ্ট যেকোনো মূর্তি, খেলনা বা কার্টুন তৈরি করা, ঘরে সংরক্ষণ করা এবং বেচাকেনা করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। শিশুদের খেলার জন্য হলেও আধুনিক যুগের প্রাণবন্ত ও সুস্পষ্ট অবয়বযুক্ত খেলনা মূর্তিগুলো পরিহার করা আবশ্যক। প্রাণীর ছবি বা আকৃতি প্রস্তুতকারীদের প্রতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহRead more
ইসলামী শরীয়তে প্রাণীর আকৃতিবিশিষ্ট যেকোনো মূর্তি, খেলনা বা কার্টুন তৈরি করা, ঘরে সংরক্ষণ করা এবং বেচাকেনা করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। শিশুদের খেলার জন্য হলেও আধুনিক যুগের প্রাণবন্ত ও সুস্পষ্ট অবয়বযুক্ত খেলনা মূর্তিগুলো পরিহার করা আবশ্যক।
প্রাণীর ছবি বা আকৃতি প্রস্তুতকারীদের প্রতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন এবং তাদের ওপর লানত (অভিশাপ) করেছেন। এই ধরনের মূর্তি বা খেলনা যারা তৈরি করে, হাশরের ময়দানে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে এগুলোতে প্রাণ দেওয়ার নির্দেশ দেবেন, যা তাদের পক্ষে কখনোই সম্ভব হবে না। ফলে তারা কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হবে।
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
إِنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَذَابًا عِنْدَ اللَّهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ الْمُصَوِّرُونَ
অর্থ: “কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে সবচেয়ে কঠিন শাস্তি ভোগ করবে ছবি বা মূর্তি প্রস্তুতকারীরা।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৫৬ এবং সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২১০৯]
অন্য একটি হাদিসে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
مَنْ صَوَّرَ صُورَةً فِي الدُّنْيَا كُلِّفَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَنْ يَنْفُخَ فِيهَا الرُّوحَ، وَلَيْسَ بِنَافِخٍ
অর্থ: “যে ব্যক্তি দুনিয়াতে কোনো (প্রাণীর) ছবি বা মূর্তি তৈরি করবে, কিয়ামতের দিন তাকে নির্দেশ দেওয়া হবে সে যেন তাতে রূহ ফুঁকে দেয়, অথচ সে কখনোই তা ফুঁকতে সক্ষম হবে না।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৬৩]
এই ধরনের খেলনা মূর্তিগুলো মূলত ভিন্ন সংস্কৃতির একটি আগ্রাসন। ছোটবেলা থেকেই শিশুদের হাতে এসব মূর্তি তুলে দেওয়ার ফলে তাদের কচি মনে মূর্তির প্রতি এক ধরনের ভালোবাসা ও আকর্ষণ তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে তাদের বিশুদ্ধ আকিদাহ ও তাওহীদের চেতনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ইসলাম মূর্তি ও শিরকের মূলোৎপাটন করতে এসেছে, তাই এর যেকোনো প্রতিচ্ছবি থেকে মুসলিম শিশুদের দূরে রাখা অভিভাবকদের ঈমানি দায়িত্ব।
এর বিকল্প হিসেবে শিশুদেরকে প্রাণহীন বস্তুর খেলনা দেওয়া যেতে পারে। যেমন: ফলমূল, ফুল, গাছপালা, গাড়ি, বিমান বা বিভিন্ন ধরনের ব্লক নির্মাণ সামগ্রী। এগুলো দিয়ে খেলা করা সম্পূর্ণ হালাল এবং এতে শিশুদের মানসিক বিকাশও ঘটে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের পরিবার ও সন্তানদেরকে শিরক এবং হারাম থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
সফর বা ভ্রমণের সময় চার রাকাতবিশিষ্ট তিনটি ফরজ সালাতকে (যোহর, আসর এবং ইশা) কসর করে দুই রাকাত পড়া শরিয়তের বিধান। এ সময় ফরজের সাথে যুক্ত সুন্নাতে মুয়াক্কাদা বা রাতেবা (যেমন যোহর, আসর, মাগরিব ও ইশার সুন্নাত) না পড়াই হলো সুন্নাহ। সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: صَحِبْتُ رَسRead more
সফর বা ভ্রমণের সময় চার রাকাতবিশিষ্ট তিনটি ফরজ সালাতকে (যোহর, আসর এবং ইশা) কসর করে দুই রাকাত পড়া শরিয়তের বিধান। এ সময় ফরজের সাথে যুক্ত সুন্নাতে মুয়াক্কাদা বা রাতেবা (যেমন যোহর, আসর, মাগরিব ও ইশার সুন্নাত) না পড়াই হলো সুন্নাহ।
সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
صَحِبْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَكَانَ لَا يَزِيدُ فِي السَّفَرِ عَلَى رَكْعَتَيْنِ وَأَبَا بَكْرٍ وَعُمَرَ وَعُثْمَانَ كَذَلِكَ
অর্থ: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে সফর করেছি, তিনি সফরে ফরজ দুই রাকাতের বেশি পড়তেন না। আবু বকর, উমর এবং উসমান (রা.) এর আমলও এমনটিই ছিল। [সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১০২]
তবে ফজরের দুই রাকাত সুন্নাত এবং বিতরের সালাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফর অবস্থাতেও তা কখনো ছাড়তেন না।
প্রথমত, যখন মুসাফির ব্যক্তি রাস্তার মাঝে চলমান অবস্থায় থাকে, তখন তার জন্য ফরজের সাথে অন্য কোনো সুন্নাত না পড়াই উত্তম।
দ্বিতীয়ত, সফর অবস্থায় গন্তব্যে পৌঁছে যদি সে কোনো স্থানে সাময়িক অবস্থান করে (যেমন হোটেলে বা আত্মীয়ের বাড়িতে), তখন তার জন্য কসরের পাশাপাশি অন্যান্য সাধারণ নফল, চাশত বা তাহাজ্জুদের মতো সালাত আদায় করা জায়েজ এবং উত্তম।
আর আপনার প্রশ্নের মূল অংশটি হলো কসর শেষে মুকিম হওয়ার ব্যাপারে। যখন একজন ব্যক্তি তার সফর শেষ করে নিজ বাড়িতে বা শহরে ফিরে আসেন এবং মুকিম হয়ে যান, তখন তার ওপর থেকে সফরের সকল বিধান উঠে যায়। মুকিম অবস্থায় তাকে অন্যান্য সাধারণ সময়ের মতোই সালাত আদায় করতে হবে এবং নিয়মিত সকল সুন্নাত ও নফল সালাতগুলো যথাযথভাবে পালন করতে হবে। তখন আর সুন্নাত ছাড়ার কোনো অবকাশ থাকে না।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
"লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ" (لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ) ইসলামে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ এবং ফজিলতপূর্ণ একটি যিকির। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই বাক্যটিকে জান্নাতের গুপ্তধনগুলোর অন্যতম হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আবু মুসা আল আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাRead more
“লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ” (لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ) ইসলামে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ এবং ফজিলতপূর্ণ একটি যিকির। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই বাক্যটিকে জান্নাতের গুপ্তধনগুলোর অন্যতম হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
আবু মুসা আল আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেন:
يَا عَبْدَ اللَّهِ بْنَ قَيْسٍ، أَلاَ أَدُلُّكَ عَلَى كَنْزٍ مِنْ كُنُوزِ الجَنَّةِ؟ فَقُلْتُ: بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ، قَالَ: قُلْ لاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ
অর্থ: “হে আব্দুল্লাহ ইবনে কাইস! আমি কি তোমাকে জান্নাতের গুপ্তধনগুলোর মধ্য থেকে একটি গুপ্তধনের সন্ধান দেব না? আমি বললাম, হ্যাঁ হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন, তুমি বলো: লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩৮৪ এবং সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭০৪]
“হাওলা” (حَوْل) শব্দটির আভিধানিক অর্থ হলো পরিবর্তন হওয়া, এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় রূপান্তরিত হওয়া, ফিরে আসা বা আশ্রয় নেওয়া। আর পরিভাষায় এবং এই যিকিরের প্রেক্ষাপটে “লা হাওলা” এর অর্থ হলো, আল্লাহর সাহায্য ও আশ্রয় ছাড়া বান্দার নিজের কোনো অবস্থা পরিবর্তন করার ক্ষমতা নেই। সালাফে সালেহীনগণ এই বাক্যটির চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
প্রখ্যাত সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) এই বাক্যটির তাফসিরে বলেন:
لَا حَوْلَ عَنْ مَعْصِيَةِ اللَّهِ إِلَّا بِعِصْمَتِهِ، وَلَا قُوَّةَ عَلَى طَاعَتِهِ إِلَّا بِمَعُونَتِهِ
অর্থ: “আল্লাহর অবাধ্যতা ও পাপ থেকে ফিরে আসার কোনো উপায় বা ক্ষমতা (হাওলা) নেই তাঁর সুরক্ষা ও আশ্রয় ছাড়া, এবং তাঁর আনুগত্য করার কোনো শক্তি (কুওয়াহ) নেই তাঁর সাহায্য ছাড়া।” [মুসনাদ আল-বাযযার, হাদিস: ৩৪৭২; হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি ও আল্লামা ইরাকি (রহ.) এর সনদকে সহিহ বলেছেন]
সুতরাং, “হাওলা” বলতে এখানে নিজের অবস্থা পরিবর্তনের ক্ষমতা এবং আল্লাহর আশ্রয় ছাড়া অন্য কোনো আশ্রয় না থাকার বিষয়টি বোঝানো হয়েছে। এর মাধ্যমে একজন মুমিন নিজের সম্পূর্ণ অক্ষমতা স্বীকার করে নেন এবং প্রমাণ করেন যে, ভালো কাজ করার শক্তি এবং মন্দ কাজ থেকে বেঁচে থাকার ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে মহান আল্লাহর সাহায্য ও ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। আল্লাহ আমাদের বেশি বেশি এই যিকিরটি পাঠ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
ইসলামী শরীয়তে যেকোনো প্রাণীর (যার রূহ বা প্রাণ আছে) ছবি আঁকা, ব্যবহার করা এবং এমন ছবিযুক্ত পোশাক পরিধান করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আর সালাতের মতো পবিত্র ও মহান ইবাদতের সময় এমন পোশাক পরিধান করা আরও বড় অপরাধ। যদি কোনো পোশাকে কোনো প্রাণীর স্পষ্ট ছবি অঙ্কিত থাকে, তাহলে সেই পোশাক পরে সালাত আদায় করলে সালাতRead more
ইসলামী শরীয়তে যেকোনো প্রাণীর (যার রূহ বা প্রাণ আছে) ছবি আঁকা, ব্যবহার করা এবং এমন ছবিযুক্ত পোশাক পরিধান করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আর সালাতের মতো পবিত্র ও মহান ইবাদতের সময় এমন পোশাক পরিধান করা আরও বড় অপরাধ।
যদি কোনো পোশাকে কোনো প্রাণীর স্পষ্ট ছবি অঙ্কিত থাকে, তাহলে সেই পোশাক পরে সালাত আদায় করলে সালাত হবে না। ছবিযুক্ত পোশাকে সালাত আদায় করা নিষিদ্ধ এবং এটি সালাতের খুশু খুজু বা একাগ্রতা নষ্ট করে দেয়। রহমতের ফেরেশতারাও এমন স্থানে প্রবেশ করেন না যেখানে প্রাণীর ছবি থাকে।
আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, আয়েশা (রা.) এর একটি পর্দা ছিল, যা দিয়ে তিনি ঘরের এক দিক ঢেকে রেখেছিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন:
أَمِيطِي عَنَّا قِرَامَكِ هَذَا، فَإِنَّهُ لَا تَزَالُ تَصَاوِيرُهُ تَعْرِضُ لِي فِي صَلَاتِي
অর্থ: “তোমার এই পর্দাটি আমার সামনে থেকে সরিয়ে ফেলো। কারণ সালাতরত অবস্থায় এর ছবিগুলো বারবার আমার সামনে ভেসে উঠছে।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৭৪]
তবে ছবির ক্ষেত্রে শরিয়তের একটি সুনির্দিষ্ট ছাড় রয়েছে, যদি ছবির প্রাণকেন্দ্র অর্থাৎ মাথা বা গলার ওপরের অংশ মুছে ফেলা বা কেটে ফেলা হয় এবং বাকি অঙ্গগুলো অস্পষ্ট থাকে, যার ফলে এটি আর কোনো পূর্ণাঙ্গ প্রাণীর আকৃতি বহন করে না (বরং গাছ বা জড় বস্তুর মতো মনে হয়), তবে সেই পোশাক পরিধান করা জায়েজ এবং তা পরে সালাত আদায় করলে সালাত শুদ্ধ হয়ে যাবে।
এর শক্তিশালী দলিল হলো, জিবরীল (আ.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ছবির ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছিলেন:
فَمُرْ بِرَأْسِ التِّمْثَالِ الَّذِي فِي الْبَيْتِ يُقْطَعُ، فَيَصِيرُ كَهَيْئَةِ الشَّجَرَةِ
অর্থ: “সুতরাং আপনি ঘরে থাকা মূর্তির (বা প্রাণীর আকৃতির) মাথা কেটে ফেলার নির্দেশ দিন, যাতে তা গাছের রূপ ধারণ করে।” [সুনান তিরমিজি, হাদিস: ২৮০৬; সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৪১৫৮; শায়খ আলবানি (রহ.) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন]
এছাড়াও প্রখ্যাত সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি বিশুদ্ধ আসারে এসেছে:
الصُّورَةُ الرَّأْسُ، فَإِذَا قُطِعَ الرَّأْسُ فَلَيْسَ بِصُورَةٍ
অর্থ: “ছবি হলো মূলত মাথা। সুতরাং যখন মাথা কেটে ফেলা হয়, তখন তা আর ছবি থাকে না।” [সুনান আল-বায়হাকি, হাদিস: ১৪৫৮১; শায়খ আলবানি (রহ.) আস-সিলসিলাতুস সহিহাহ গ্রন্থে (১৯২১ নম্বর) একে সহিহ বলেছেন]
সারসংক্ষেপ হলো, সালাতের জন্য শরীর ও পোশাক পবিত্র এবং শরিয়তসম্মত হওয়া আবশ্যক। তাই প্রাণীর স্পষ্ট ছবিযুক্ত পোশাকে সালাত আদায় করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বিশুদ্ধভাবে ইবাদত করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
প্রশ্ন নং ৬০ ‣ স্ত্রী আর সন্তান নিতে না চাইলে এবং স্বামীর অধিকার আদায়ে অবহেলা করলে স্বামীর করণীয় কী?
প্রশ্নে উল্লেখিত পরিস্থিতির আলোকে ইসলামী শরীয়তের বিধান অত্যন্ত সুস্পষ্ট। এখানে স্ত্রীর পক্ষ থেকে দুটি মারাত্মক শরয়ি ত্রুটি ও অবাধ্যতা প্রকাশ পাচ্ছে। কুরআন, সহিহ সুন্নাহ এবং সালাফে সালেহীনদের বিশুদ্ধ মানহাজ অনুযায়ী এর সমাধান হলো: প্রথমত: সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে সন্তান দান করা বা না করRead more
প্রশ্নে উল্লেখিত পরিস্থিতির আলোকে ইসলামী শরীয়তের বিধান অত্যন্ত সুস্পষ্ট। এখানে স্ত্রীর পক্ষ থেকে দুটি মারাত্মক শরয়ি ত্রুটি ও অবাধ্যতা প্রকাশ পাচ্ছে। কুরআন, সহিহ সুন্নাহ এবং সালাফে সালেহীনদের বিশুদ্ধ মানহাজ অনুযায়ী এর সমাধান হলো:
See lessপ্রথমত: সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে
সন্তান দান করা বা না করা সম্পূর্ণ মহান আল্লাহর ইখতিয়ার। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন:
لِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ يَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ إِنَاثًا وَيَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ الذُّكُورَ
অর্থ: “আসমান ও জমিনের রাজত্ব একমাত্র আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যাসন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্রসন্তান দান করেন।” [সূরা আশ শুরা: ৪৯]
ইসলামে উপযুক্ত শরয়ি ওজর বা মায়ের জীবনের ঝুঁকির মতো চরম শারীরিক অক্ষমতা ছাড়া স্থায়ীভাবে জন্ম নিয়ন্ত্রণ করা বা আর কখনোই সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্পূর্ণ নাজায়েজ এবং ফিতরাত বিরোধী একটি কাজ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতকে বেশি বেশি সন্তান জন্মদানের নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি বলেছেন:
تَزَوَّجُوا الْوَدُودَ الْوَلُودَ إِنِّي مُكَاثِرٌ بِكُمُ الأَنْبِيَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
অর্থ: “তোমরা এমন নারীকে বিবাহ করো, যে বেশি প্রেমময়ী এবং অধিক সন্তান প্রসবকারিণী। কারণ কিয়ামতের দিন আমি অন্যান্য নবীদের সামনে তোমাদের আধিক্য নিয়ে গর্ব করব।” [সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ২০৫০; শায়খ আলবানি (রহ.) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন]
তাই আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর নিজের সিদ্ধান্তকে চাপিয়ে দেওয়া চরম আকিদাগত দুর্বলতা ও অজ্ঞতা। অনেক সম্পদশালী ব্যক্তি একটি সন্তান নিয়ে আর সন্তান নিতে চাননি, পরবর্তীতে দুর্ঘটনায় সেই সন্তান মারা যাওয়ার পর তারা সারাজীবন অনুশোচনা করেছেন। তাই এই স্ত্রীর উচিত নিজের ঈমান ও আকিদাহ পরিশুদ্ধ করা এবং আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট হওয়া।
দ্বিতীয়ত: স্বামীর ডাকে সাড়া না দেওয়া
কোনো স্ত্রীর জন্য শরয়ি ওজর (যেমন মাসিক, নেফাস বা চরম অসুস্থতা) ছাড়া স্বামীর ডাকে সাড়া না দেওয়া বা শারীরিক সম্পর্ক থেকে বিরত থাকা একটি কবিরা গুনাহ। এর ফলে সে আল্লাহর লানত ও ফেরেশতাদের অভিশাপের পাত্রী হয়।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
إِذَا دَعَا الرَّجُلُ امْرَأَتَهُ إِلَى فِرَاشِهِ فَأَبَتْ فَبَاتَ غَضْبَانَ عَلَيْهَا لَعَنَتْهَا الْمَلاَئِكَةُ حَتَّى تُصْبِحَ
অর্থ: “স্বামী যখন তার স্ত্রীকে বিছানায় ডাকে, আর স্ত্রী যদি তা অস্বীকার করে এবং স্বামী তার ওপর রাগ করে রাত কাটায়, তাহলে সকাল হওয়া পর্যন্ত ফেরেশতারা সেই স্ত্রীর ওপর অভিশাপ দিতে থাকে।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২৩৭ এবং সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪৩৬]
তৃতীয়ত: স্বামীর করণীয় এবং বহুবিবাহের সমাধান
দীর্ঘ ৮ বছর ধরে স্ত্রী যদি এমন আচরণ করে এবং অনুতপ্ত না হয়, তবে স্বামীর নিজের চরিত্র ও ঈমান হেফাজত করা ফরজ। একজন সক্ষম পুরুষের জন্য নিজের পবিত্রতা রক্ষার্থে এবং চোখের হিফাজতের জন্য একাধিক বিবাহ করা শরীয়তসম্মত ও উত্তম একটি সমাধান।
জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
إِذَا أَحَدُكُمْ أَعْجَبَتْهُ الْمَرْأَةُ فَوَقَعَتْ فِي قَلْبِهِ فَلْيَعْمِدْ إِلَى امْرَأَتِهِ فَلْيُوَاقِعْهَا فَإِنَّ ذَلِكَ يَرُدُّ مَا فِي نَفْسِهِ
অর্থ: “যদি তোমাদের কারো কোনো নারীর প্রতি দৃষ্টি পড়ে এবং তার প্রতি আকৃষ্ট হয়, তবে সে যেন তার স্ত্রীর কাছে যায় এবং তার সাথে মিলিত হয়। এটি তার অন্তরের কুমন্ত্রণা দূর করে দেবে।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪০৩]
এখন প্রথম স্ত্রী যদি মাসের পর মাস স্বামীর প্রয়োজন পূরণে অপারগ বা অবাধ্য হয়, তবে দ্বিতীয় স্ত্রী থাকলে স্বামী সহজেই নিজেকে হারাম থেকে বাঁচাতে পারে। সালাফে সালেহীনগণ সক্ষম পুরুষদের বিবাহের প্রতি উৎসাহ দিতেন। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) তার ছাত্র সাঈদ ইবনে জুবায়েরকে বলেছিলেন, “বিবাহ করো, কেননা এই উম্মতের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির (অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর) সবচেয়ে বেশি স্ত্রী ছিল।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৬৯]
চতুর্থত: স্ত্রীদের মাঝে সমতা বিধান এবং প্রথম স্ত্রীর আচরণ
যদি স্বামী দ্বিতীয় বিবাহ করেন, তবে প্রথম স্ত্রীর কোনো অধিকার নেই তাতে বাধা দেওয়া বা সতিনের তালাক দাবি করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
لاَ تَسْأَلِ الْمَرْأَةُ طَلاَقَ أُخْتِهَا لِتَسْتَفْرِغَ صَحْفَتَهَا
অর্থ: “কোনো নারী যেন তার (মুসলিম) বোনের তালাক দাবি না করে, যাতে তার পাত্রটি সে একাই শূন্য করে নিতে পারে। সে যেন বিবাহ বন্ধনে থাকে, কারণ তার তাকদিরে যা আছে সে তা পাবেই।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫১৫২]
তবে স্বামীকে অবশ্যই একাধিক স্ত্রীর মাঝে সময়, রাত্রীযাপন এবং ভরণপোষণের ক্ষেত্রে পূর্ণ ইনসাফ ও সমতা বজায় রাখতে হবে। এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল দায়িত্ব। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সতর্ক করে বলেছেন:
مَنْ كَانَتْ لَهُ امْرَأَتَانِ فَمَالَ إِلَى إِحْدَاهُمَا جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَشِقُّهُ مَائِلٌ
অর্থ: “যে ব্যক্তির দুজন স্ত্রী আছে কিন্তু সে তাদের একজনের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ল (অর্থাৎ বৈষম্য করল), সে কিয়ামতের দিন এমন অবস্থায় উঠবে যে তার শরীরের একাংশ অবশ বা ঝুলন্ত থাকবে।” [সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ২১৩৩; শায়খ আলবানি (রহ.) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন]
(অন্তরের ভালোবাসা মানুষের নিয়ন্ত্রণে নেই, তাই শুধুমাত্র বাহ্যিক এবং বৈষয়িক সমতা বিধানই স্বামীর ওপর ফরজ)।
সুতরাং উক্ত ভাইয়ের উচিত প্রথমে স্ত্রীকে কুরআন ও সুন্নাহর ভয় দেখিয়ে সংশোধন করার চেষ্টা করা। প্রয়োজনে দুই পরিবারের মুরব্বিদের নিয়ে শালিস করা। যদি স্ত্রী এরপরও অবাধ্যতায় অটল থাকে, তবে স্বামী নিজের চরিত্র রক্ষার্থে ইনসাফ করার সামর্থ্য সাপেক্ষে দ্বিতীয় বিবাহ করতে পারেন অথবা শরীয়তের নিয়ম অনুযায়ী তাকে তালাক দিয়ে একজন দ্বীনদার ও অনুগত নারীকে বিবাহ করতে পারেন। আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।
প্রশ্ন নং ৫৯ ‣ যথাসাধ্য চেষ্টা করার পরও সন্তান জামাআতে সালাত আদায় না করলে পিতার করণীয় কী?
সন্তানকে দ্বীনের ওপর গড়ে তোলা এবং সালাতে অভ্যস্ত করা পিতা মাতার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। ইসলামী শরীয়তে ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে সালাতের জন্য নির্দেশ দেওয়ার সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: مُرُوا أَوْلَادَكُمْ بِالصَّلَاةِ وَهُمْ أَبْنَاءُ سَبْعِ سِنِينَ، وَRead more
সন্তানকে দ্বীনের ওপর গড়ে তোলা এবং সালাতে অভ্যস্ত করা পিতা মাতার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। ইসলামী শরীয়তে ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে সালাতের জন্য নির্দেশ দেওয়ার সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে।
See lessরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
مُرُوا أَوْلَادَكُمْ بِالصَّلَاةِ وَهُمْ أَبْنَاءُ سَبْعِ سِنِينَ، وَاضْرِبُوهُمْ عَلَيْهَا، وَهُمْ أَبْنَاءُ عَشْرٍ
অর্থ: “তোমাদের সন্তানদের বয়স সাত বছর হলে তাদেরকে সালাতের নির্দেশ দাও। আর যখন তাদের বয়স দশ বছর হয়, তখন সালাত আদায় না করলে তাদেরকে প্রহার করো (শাসন করো)।” [সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৫; শায়খ আলবানি (রহ.) হাদিসটিকে হাসান সহিহ বলেছেন]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এই সুন্নাহ অনুযায়ী সন্তানকে শৈশব থেকেই গড়ে তুললে, পরবর্তীতে তাদের সালাতে অমনোযোগী বা বেনামাজি হওয়ার আশঙ্কা খুবই কম থাকে।
তবে এরপরও যদি কোনো সন্তান সালাতে অবহেলা করে এবং বারবার বোঝানোর পরও জামাতের সাথে সালাত আদায় না করে, তবে পিতার দায়িত্ব হলো হাল না ছেড়ে দিয়ে ধারাবাহিকভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। কারণ পিতা হলেন তার পরিবারের দায়িত্বশীল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
الرَّجُلُ رَاعٍ فِي أَهْلِهِ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ
অর্থ: “পুরুষ তার পরিবারের অভিভাবক, এবং তাকে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত করা হবে।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৯৩]
এ অবস্থায় পিতার করণীয় বিষয়গুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. নসিহত ও আখিরাতের ভয় প্রদর্শন: সন্তানকে জাহান্নামের আজাব এবং সালাত তরক করার ভয়াবহ পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দিতে হবে। আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا
অর্থ: “হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও।” [সূরা আত-তাহরীম: ৬]
২. সম্পর্ক ছিন্ন না করে হিকমাহর সাথে শাসন: সালাফে সালেহীন এবং সমসাময়িক উলামায়ে কেরাম (যেমন শায়খ ইবনে বাজ ও শায়খ ইবনে উসাইমিন রহ.) এর ফতোয়া অনুযায়ী, সন্তান বেনামাজি হলে তার সাথে তখনই সম্পর্ক ছিন্ন করা (হাজর করা) উচিত নয়, যদি সম্পর্ক ছিন্ন করলে সে আরও বেশি অবাধ্য বা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বরং তাকে কাছে রেখে, বুঝিয়ে এবং হিকমাহর সাথে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। শরীয়তে সম্পর্ক ছিন্ন করার মূল উদ্দেশ্য হলো সংশোধন করা, যদি তা বৃহত্তর ক্ষতির কারণ হয় তবে তা সাময়িকভাবে পরিহার করে নসিহত চালিয়ে যেতে হবে।
৩. অবিরাম দোয়া করা: পিতা মাতার দোয়া সন্তানের জন্য অত্যন্ত কার্যকর এবং তা দ্রুত কবুল হয়। সন্তানের হিদায়াতের জন্য আল্লাহর কাছে বেশি বেশি কান্নাকাটি করে দোয়া করতে হবে। বিশেষ করে রাতের শেষ ভাগে তাহাজ্জুদের সালাতে সিজদাহরত অবস্থায় দোয়া করা উত্তম।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
أَقْرَبُ مَا يَكُونُ الْعَبْدُ مِنْ رَبِّهِ وَهُوَ سَاجِدٌ فَأَكْثِرُوا الدُّعَاءَ
অর্থ: “বান্দা তার রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী হয় যখন সে সিজদাহরত থাকে। সুতরাং তোমরা তখন বেশি বেশি দোয়া করো।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৮২]
এছাড়াও কুরআনে বর্ণিত এই দোয়াটি বেশি বেশি পড়া উচিত:
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
অর্থ: “হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের পক্ষ থেকে আমাদের জন্য চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদেরকে মুত্তাকিদের জন্য আদর্শ বানিয়ে দিন।” [সূরা আল-ফুরকান: ৭৪]
পিতা হিসেবে আপনার দায়িত্ব হলো ধৈর্য ধারণ করে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। হিদায়াত দেওয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ। এভাবে নিরলস চেষ্টা ও দোয়া অব্যাহত রাখলে আশা করা যায় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাকে দ্বীনের প্রতি অনুরাগী করবেন। আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।
প্রশ্ন নং ৫৮ ‣ জিহাদ কখন ফরজে আইন ও ফরজে কেফায়া হয়?
জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ ইসলামের অন্যতম একটি সর্বোচ্চ ইবাদত। শরীয়তের বিধান অনুযায়ী, সাধারণ অবস্থায় জিহাদ হলো 'ফরজে কিফায়া' বা সামষ্টিক ফরজ। অর্থাৎ, মুসলিমদের মধ্য থেকে একটি দল বা অংশ যদি জিহাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে আঞ্জাম দেন, তবে বাকিদের ওপর থেকে এর বাধ্যবাধকতা রহিত হয়ে যাবে। কিন্তু যদি কেউই এই দাযRead more
জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ ইসলামের অন্যতম একটি সর্বোচ্চ ইবাদত। শরীয়তের বিধান অনুযায়ী, সাধারণ অবস্থায় জিহাদ হলো ‘ফরজে কিফায়া’ বা সামষ্টিক ফরজ। অর্থাৎ, মুসলিমদের মধ্য থেকে একটি দল বা অংশ যদি জিহাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে আঞ্জাম দেন, তবে বাকিদের ওপর থেকে এর বাধ্যবাধকতা রহিত হয়ে যাবে। কিন্তু যদি কেউই এই দায়িত্ব পালন না করে, তবে সক্ষম সকল মুসলিমই ফরজ লঙ্ঘনের কারণে গুনাহগার হবে।
See lessতবে সালাফে সালেহীন এবং জুমহুর ফুকাহায়ে কেরামের ঐকমত্যে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট অবস্থায় জিহাদ প্রত্যেক সক্ষম মুসলিমের ওপর ‘ফরজে আইন’ বা ব্যক্তিগত ফরজ হয়ে যায়। এই অবস্থাগুলো কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে আলোচনা করা হলো:
১. মুসলিম ভূখণ্ড আক্রান্ত হলে:
কোনো মুসলিম ভূখণ্ড যদি কাফির বা শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হয়, তখন সেই ভূখণ্ড এবং নিজেদের জান, মাল ও দ্বীন রক্ষা করা ঐ অঞ্চলের সকল মুসলিমের ওপর ফরজে আইন হয়ে যায়। ইসলামী ফিকহে একে ‘দাফউস সায়িল’ বা আক্রমণকারীকে প্রতিহত করা বলা হয়। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) এ বিষয়ে বলেন, “আক্রমণকারী শত্রুকে প্রতিহত করার চেয়ে ঈমানের পর অন্য কোনো ফরজ অধিক গুরুত্বপূর্ণ নয়।” [আল ফাতাওয়া আল কুবরা]
যদি ঐ অঞ্চলের মুসলিমরা তাদের ভূমি রক্ষা করতে সক্ষম না হন, তবে তাদের নিকটবর্তী পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মুসলিমদের ওপরও জিহাদ ফরজে আইন হয়। তারাও সক্ষম না হলে তাদের নিকটবর্তী অঞ্চলের ওপর ফরজ হয়। এভাবে পর্যায়ক্রমে শত্রুকে প্রতিহত করা পর্যন্ত সারা বিশ্বের মুসলিমদের ওপর এটি ফরজে আইন হিসেবে বর্তায়।
২. দখলকৃত ভূমি উদ্ধার করার ক্ষেত্রে:
শত্রুর কবল থেকে দখলকৃত মুসলিম ভূমি উদ্ধার করার জন্যও জিহাদ ফরজে আইন। যতদিন পর্যন্ত না সেই ভূমি সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত হয়, এই ফরজ দায়িত্ব পর্যায়ক্রমে মুসলিম উম্মাহর ওপর বহাল থাকে।
৩. নির্যাতিত মুসলিমদের সাহায্যার্থে:
যদি কোনো মুসলিম ভাই বোনেরা শত্রু কর্তৃক নির্যাতিত হয়ে অন্য মুসলিমদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে, তখন তাদেরকে উদ্ধার করা নিকটবর্তী মুসলিমদের ওপর ফরজে আইন হয়ে যায়। তারা সক্ষম না হলে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য মুসলিমদের ওপর তা ফরজ হয়।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পবিত্র কুরআনে মুমিনদেরকে এই নির্দেশ দিয়ে বলেন:
وَمَا لَكُمْ لَا تُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالْمُسْتَضْعَفِينَ مِنَ الرِّجَالِ وَالنِّسَاءِ وَالْوِلْدَانِ
অর্থ: “তোমাদের কী হলো যে, তোমরা আল্লাহর পথে এবং অসহায় নরনারী ও শিশুদের রক্ষার্থে যুদ্ধ করছ না?” [সূরা আন-নিসা: ৭৫]
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِنِ اسْتَنْصَرُوكُمْ فِي الدِّينِ فَعَلَيْكُمُ النَّصْرُ
অর্থ: “তবে তারা যদি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের কাছে সাহায্য চায়, তবে তাদেরকে সাহায্য করা তোমাদের কর্তব্য।” [সূরা আল-আনফাল: ৭২]
উম্মাহর এই পারস্পরিক দায়িত্ববোধের বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন:
مَثَلُ الْمُؤْمِنِينَ فِي تَوَادِّهِمْ وَتَرَاحُمِهِمْ وَتَعَاطُفِهِمْ مَثَلُ الْجَسَدِ إِذَا اشْتَكَى مِنْهُ عُضْوٌ تَدَاعَى لَهُ سَائِرُ الْجَسَدِ بِالسَّهَرِ وَالْحُمَّى
অর্থ: “মুমিনদের পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া ও সহানুভূতির দৃষ্টান্ত একটি দেহের ন্যায়। যখন তার কোনো একটি অঙ্গ আক্রান্ত হয়, তখন গোটা দেহ জ্বর ও অনিদ্রায় ভুগে।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৬]
যে অবস্থায় জিহাদ ফরজে কিফায়া থাকে, তখনও প্রতিটি মুসলিমকে অন্তরে জিহাদের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতে হবে। অন্যথায় হাদিসের ভাষ্যমতে তার মাঝে মুনাফেকির শাখা থেকে যায়। আর জিহাদ যে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত একটি মহান ফরজ ইবাদত, এই দৃঢ় বিশ্বাস অন্তরে ধারণ করা সকল সক্ষম মুসলিমের জন্য অপরিহার্য। যারা জিহাদকে ফরজ ইবাদত হিসেবে স্বীকার করে না বা অস্বীকার করে, তারা আল্লাহর একটি অকাট্য বিধান লঙ্ঘনের কারণে ভয়াবহ অপরাধী হিসেবে পরিগণিত হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করুন। আমিন।
প্রশ্ন নং ৫৭ ‣ সেলফ অ্যাপের মাধ্যমে পার্ট টাইম কাজ করে ইনকাম কি হালাল হবে?
যেকোনো অ্যাপ (যেমন: সেলফ অ্যাপ) বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অনলাইনে কাজ করে অর্থ উপার্জন করাটা মূলত কাজের ধরনের ওপর নির্ভর করে। ইসলামী শরীয়তের একটি সুপরিচিত ফিকহি মূলনীতি হলো, মুয়ামালাত বা লেনদেনের ক্ষেত্রে মূল বিধান হলো তা মুবাহ বা বৈধ, যতক্ষণ না তা হারাম হওয়ার সুস্পষ্ট কোনো কারণ পাওয়া যায়। তাই সেলRead more
যেকোনো অ্যাপ (যেমন: সেলফ অ্যাপ) বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অনলাইনে কাজ করে অর্থ উপার্জন করাটা মূলত কাজের ধরনের ওপর নির্ভর করে। ইসলামী শরীয়তের একটি সুপরিচিত ফিকহি মূলনীতি হলো, মুয়ামালাত বা লেনদেনের ক্ষেত্রে মূল বিধান হলো তা মুবাহ বা বৈধ, যতক্ষণ না তা হারাম হওয়ার সুস্পষ্ট কোনো কারণ পাওয়া যায়।
See lessতাই সেলফ অ্যাপ বা এই জাতীয় প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আপনার পার্ট টাইম কাজ ও ইনকাম হালাল হওয়ার জন্য নিম্নের শর্তগুলো পূরণ হওয়া আবশ্যক:
১. কাজের ধরন হালাল হওয়া: আপনি অ্যাপটিতে যে কাজটি করবেন (যেমন: রিসেলিং, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং বা প্রমোশন), তা শরীয়তসম্মত হতে হবে। যদি সেখানে কোনো হারাম পণ্য (যেমন: গানবাদ্য, অশ্লীলতা, হারাম বা ক্ষতিকর কোনো বস্তু) বিক্রি বা প্রমোশন করতে হয়, তবে তা থেকে অর্জিত আয় হারাম হবে।
২. হারাম কাজে সহযোগিতা না করা: কোনো হারাম পণ্যের প্রচারে বা অবৈধ কাজে পরোক্ষভাবেও সহযোগিতা করা যাবে না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন:
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
অর্থ: “সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পরের সাহায্য করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অন্যের সাহায্য করো না।” [সূরা আল-মায়েদাহ: ২]
৩. ধোঁকা বা গারার না থাকা: কাজের বিবরণ, পারিশ্রমিক এবং লেনদেন একদম সুস্পষ্ট হতে হবে। এতে কোনো ধরনের ধোঁকা, প্রতারণা বা অস্পষ্টতা (গারার) থাকা যাবে না। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
مَنْ غَشَّ فَلَيْسَ مِنِّي
অর্থ: “যে প্রতারণা করে, সে আমার দলভুক্ত নয়।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১]
৪. এমএলএম (MLM) বা পিরামিড স্কিম না হওয়া: অ্যাপটির আয়ের উৎস যদি এমন হয় যে, শুধু টাকার বিনিময়ে নতুন সদস্য যুক্ত করার মাধ্যমেই কমিশন পাওয়া যায় (যেখানে বাস্তব ও হালাল কোনো পণ্যের স্বাভাবিক লেনদেন মূল উদ্দেশ্য নয়), তবে তা মাল্টি লেভেল মার্কেটিং বা এমএলএম এর অন্তর্ভুক্ত হবে, যা অধিকাংশ সালাফি উলামায়ে কেরাম এবং ইসলামিক ফিকহ একাডেমির বিশুদ্ধ ফতোয়া অনুযায়ী নাজায়েজ।
তবে যদি এটি সরাসরি শরীয়তসম্মত পণ্যের রিসেলিং হয় এবং হালাল পণ্য বিক্রয়ের ওপর আপনাকে একটি নির্দিষ্ট কমিশন দেওয়া হয়, তবে তা ইসলামে ‘দালালি’ বা ব্রোকারেজ হিসেবে গণ্য হবে, যা শর্তসাপেক্ষে জায়েজ।
সারসংক্ষেপ হলো,অ্যাপটির আয়ের মাধ্যম, কাজের প্রকৃতি এবং লেনদেন যদি সম্পূর্ণ বৈধ হয় এবং হারাম কোনো কাজের সাথে সম্পৃক্ততা না থাকে, তবে সেখান থেকে ইনকাম করা হালাল হবে। আর যদি তাতে হারাম বা প্রতারণার কোনো সংমিশ্রণ থাকে, তবে তা বর্জন করা একজন মুমিনের জন্য অপরিহার্য। আল্লাহ তাআলা আমাদের হালাল রিজিক অন্বেষণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
প্রশ্ন নং ৫৬ ‣ এক সাথে তিন তালাক দিলে কি তিন তালাক হয় এবং রাগ করে স্ত্রীকে বাবার বাড়ি যেতে বললে কি তালাক হয়ে যাবে?
আপনার প্রশ্নে মূলত দুটি ভিন্ন বিষয় রয়েছে। প্রথম অংশ: একসাথে তিন তালাক দেওয়ার বিধান ইসলামী শরীয়তে একসাথে একই মজলিসে তিন তালাক দেওয়া বিদআত এবং এটি একটি হারাম কাজ। কেউ যদি অজ্ঞতাবশত বা রাগের বশবর্তী হয়ে এমনটি করে, তবে বিশুদ্ধ মত এবং সালাফি উলামায়ে কেরামের ফতোয়া অনুযায়ী তা এক তালাক বা 'তালাকে রRead more
আপনার প্রশ্নে মূলত দুটি ভিন্ন বিষয় রয়েছে।
প্রথম অংশ: একসাথে তিন তালাক দেওয়ার বিধান
ইসলামী শরীয়তে একসাথে একই মজলিসে তিন তালাক দেওয়া বিদআত এবং এটি একটি হারাম কাজ। কেউ যদি অজ্ঞতাবশত বা রাগের বশবর্তী হয়ে এমনটি করে, তবে বিশুদ্ধ মত এবং সালাফি উলামায়ে কেরামের ফতোয়া অনুযায়ী তা এক তালাক বা ‘তালাকে রাজয়ী’ (প্রত্যাহারযোগ্য তালাক) হিসেবে গণ্য হবে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে একসাথে তিন তালাক দেওয়াকে অত্যন্ত গর্হিত কাজ মনে করা হতো। মাহমুদ ইবনে লাবীদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
أُخْبِرَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ رَجُلٍ طَلَّقَ امْرَأَتَهُ ثَلَاثَ تَطْلِيقَاتٍ جَمِيعًا فَقَامَ غَضْبَانًا ثُمَّ قَالَ أَيُلْعَبُ بِكِتَابِ اللَّهِ وَأَنَا بَيْنَ أَظْهُرِكُمْ
অর্থ: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এমন এক ব্যক্তি সম্পর্কে জানানো হলো, যে তার স্ত্রীকে একসাথে তিন তালাক দিয়েছে। তখন তিনি রাগান্বিত হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং বললেন, আমি তোমাদের মাঝে জীবিত থাকতেই কি আল্লাহর কিতাব নিয়ে খেলা করা হচ্ছে? এমনকি এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি কি তাকে হত্যা করব?” [সুনান আন-নাসায়ী, হাদিস: ৩৪০১; শায়খ আলবানি (রহ.) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন]
একসাথে দেওয়া তিন তালাক যে এক তালাক হিসেবেই গণ্য হয়, তার অকাট্য দলিল হলো আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) এর হাদিস। তিনি বলেন:
كَانَ الطَّلاَقُ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَأَبِي بَكْرٍ وَسَنَتَيْنِ مِنْ خِلاَفَةِ عُمَرَ طَلاَقُ الثَّلاَثِ وَاحِدَةً
অর্থ: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে, আবু বকর (রা.) এর যুগে এবং উমর (রা.) এর খিলাফাতের প্রথম দুই বছর পর্যন্ত একসাথে দেওয়া তিন তালাক এক তালাক হিসেবেই গণ্য হতো।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪৭২]
পরবর্তীতে মানুষ যখন এই ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন শুরু করল এবং একসাথে তিন তালাক দেওয়ার প্রবণতা বাড়িয়ে দিল, তখন খলিফা উমর (রা.) মানুষের জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা (তাযির) হিসেবে এটিকে তিন তালাক হিসেবে প্রয়োগ করার প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে শরিয়তের মূল বিধান হলো এটি এক তালাক হিসেবেই ধর্তব্য হবে। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.), ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) সহ সমসাময়িক অধিকাংশ বড় উলামায়ে কেরামের ফতোয়া এটিই।
সুন্নাহসম্মত তালাকের পদ্ধতি:
তালাক দেওয়ার সুন্নাহ পদ্ধতি হলো, স্ত্রীর এমন পবিত্র অবস্থায় (তুহুর) তাকে কেবল এক তালাক দেওয়া, যে পবিত্র অবস্থায় স্বামীর সাথে তার কোনো শারীরিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়নি। এরপর স্ত্রী তার স্বামীর বাড়িতেই ইদ্দত পালন করবে। ইদ্দত হলো স্ত্রীর তিনটি মাসিক ঋতুস্রাব (পিরিয়ড) পার হওয়া। এই ইদ্দত চলাকালীন যেকোনো সময় স্বামী চাইলে স্ত্রীকে মৌখিক বা শারীরিকভাবে ফিরিয়ে নিতে (রুজু করতে) পারবে।
যদি ইদ্দত শেষ হয়ে যায় এবং স্বামী রুজু না করে, তবে স্ত্রী ‘বাইন’ তালাকপ্রাপ্তা হয়ে যাবে। তখন সে মুক্ত এবং চাইলে অন্য কাউকে বিবাহ করতে পারবে। আর যদি প্রথম স্বামী-স্ত্রী উভয়ে আবার একসাথে সংসার করতে রাজি হয়, তবে তারা নতুন করে মোহরানা নির্ধারণ করে পুনরায় বিবাহ (আকদ) করতে পারবে।
কিন্তু স্বামী যদি তিন ধাপে (আলাদা আলাদা তিনটি পবিত্র অবস্থায়) তিনবার তালাক দেয়, তবে স্ত্রী চিরতরে হারাম হয়ে যাবে (তালাকে মুগাল্লাযাহ)। এরপর সে স্ত্রী অন্য কোথাও স্বাভাবিকভাবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যদি কখনো স্বামী মারা যায় বা তালাকপ্রাপ্ত হয়, কেবল তখনই সে পূর্বের স্বামীর জন্য হালাল হতে পারে। পূর্বপরিকল্পিত চুক্তিভিত্তিক বিবাহ বা ‘হালালা’ শরীয়তে সম্পূর্ণ হারাম এবং অভিশপ্ত।
দ্বিতীয় অংশ: রাগ করে বাবার বাড়ি যেতে বলা
See lessইসলামী ফিকহ অনুযায়ী, রাগ করে স্ত্রীকে “বাবার বাড়ি চলে যাও” বা “তোমার পরিবারের কাছে ফিরে যাও” বলাটা তালাকের সুস্পষ্ট শব্দ (সরিহ) নয়, বরং এটি তালাকের ইঙ্গিতবহ শব্দ (কিনায়াহ)।
ইঙ্গিতবহ শব্দ দ্বারা তালাক পতিত হওয়া বা না হওয়া সম্পূর্ণ নির্ভর করে স্বামীর নিয়তের ওপর।
১. স্বামী যদি “বাবার বাড়ি চলে যাও” বলার সময় মনে মনে তালাক দেওয়ার নিয়ত করে থাকে, তবে এক তালাক (রাজয়ী) পতিত হবে।
২. আর যদি সে তালাকের নিয়ত না করে কেবল রাগ সামলাতে, ধমক দিতে বা কিছুদিনের জন্য তাকে বাবার বাড়িতে পাঠাতে চেয়ে এই কথা বলে থাকে, তবে এর দ্বারা কোনো তালাক হবে না।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কাব ইবনে মালিক (রা.) কে তার স্ত্রীর কাছ থেকে সাময়িক আলাদা থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন, তখন কাব (রা.) জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আমি কি তাকে তালাক দেব?” নবীজি বললেন, “না, তুমি কেবল তার থেকে আলাদা থাকো।” তখন কাব (রা.) তার স্ত্রীকে বলেছিলেন, “الحقي بأهلك” (তুমি তোমার পরিবারের কাছে চলে যাও)। যেহেতু কাব (রা.) এর তালাকের নিয়ত ছিল না, তাই সেখানে কোনো তালাক পতিত হয়নি। [সহিহ বুখারি ও মুসলিম]
সুতরাং, এ ক্ষেত্রে স্বামীর নিয়ত কী ছিল, তার ভিত্তিতেই ফয়সালা হবে। আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।
প্রশ্ন নং ৫৫ ‣ হেঁটে হেঁটে মিসওয়াক করা যাবে কি?
হেঁটে হেঁটে মিসওয়াক করা ইসলামী শরীয়তে সম্পূর্ণ জায়েজ। ইসলামী ফিকহের একটি সুপরিচিত ও সর্বসম্মত মূলনীতি হলো "আল আসলু ফিল আশয়া আল ইবাহাহ" অর্থাৎ, ইবাদত ব্যতীত দুনিয়াবী বা সাধারণ যেকোনো কাজ ও বস্তুর ক্ষেত্রে মূল বিধান হলো তা মুবাহ বা বৈধ, যতক্ষণ না তা হারাম বা নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে কুরআন বা সুন্নRead more
হেঁটে হেঁটে মিসওয়াক করা ইসলামী শরীয়তে সম্পূর্ণ জায়েজ। ইসলামী ফিকহের একটি সুপরিচিত ও সর্বসম্মত মূলনীতি হলো “আল আসলু ফিল আশয়া আল ইবাহাহ” অর্থাৎ, ইবাদত ব্যতীত দুনিয়াবী বা সাধারণ যেকোনো কাজ ও বস্তুর ক্ষেত্রে মূল বিধান হলো তা মুবাহ বা বৈধ, যতক্ষণ না তা হারাম বা নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে কুরআন বা সুন্নাহর কোনো সুস্পষ্ট দলিল পাওয়া যায়। হেঁটে হেঁটে মিসওয়াক করা নিষেধ হওয়ার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বা সাহাবায়ে কেরাম থেকে কোনো সহিহ দলিল তো দূরের কথা, কোনো যয়িফ (দুর্বল) হাদিসও বর্ণিত হয়নি।
See lessমিসওয়াক করা একটি অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ সুন্নাহ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদাই মিসওয়াক করতে ভালোবাসতেন এবং উম্মতকে এর প্রতি ব্যাপকভাবে উদ্বুদ্ধ করেছেন।
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
السِّوَاكُ مَطْهَرَةٌ لِلْفَمِ مَرْضَاةٌ لِلرَّبِّ
অর্থ: “মিসওয়াক হলো মুখমণ্ডল পবিত্র করার মাধ্যম এবং রবের সন্তুষ্টি অর্জনের উপায়।” [সুনান আন-নাসায়ী, হাদিস: ৫; শায়খ আলবানি (রহ.) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন]
আমাদের সমাজে বা কিছু মানুষের মুখে এমন কথা প্রচলিত আছে যে, হেঁটে হেঁটে মিসওয়াক করলে শারীরিক ক্ষতি হয় বা এটি অনুচিত। কিন্তু সালাফে সালেহীন ও নির্ভরযোগ্য উলামায়ে কেরামের ফতোয়া অনুযায়ী, এর কোনো শরয়ি বা সুনিশ্চিত চিকিৎসাবিজ্ঞানগত ভিত্তি নেই। এটি নিছক একটি ভিত্তিহীন ধারণা।
সুতরাং, কেউ যদি সময় বাঁচানোর জন্য বা স্বাভাবিকভাবে পথে চলতে চলতে বা হেঁটে হেঁটে মিসওয়াক করেন, তবে তাতে শরিয়তের দৃষ্টিতে বিন্দুমাত্র কোনো সমস্যা বা গুনাহ নেই। এর কারণে মিসওয়াকের সুন্নাহর সওয়াব থেকেও বঞ্চিত হতে হবে না। আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।
প্রশ্ন নং ৫৪ ‣ খেলনা মূর্তির বিষয়ে ইসলাম কী বলে?
ইসলামী শরীয়তে প্রাণীর আকৃতিবিশিষ্ট যেকোনো মূর্তি, খেলনা বা কার্টুন তৈরি করা, ঘরে সংরক্ষণ করা এবং বেচাকেনা করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। শিশুদের খেলার জন্য হলেও আধুনিক যুগের প্রাণবন্ত ও সুস্পষ্ট অবয়বযুক্ত খেলনা মূর্তিগুলো পরিহার করা আবশ্যক। প্রাণীর ছবি বা আকৃতি প্রস্তুতকারীদের প্রতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহRead more
ইসলামী শরীয়তে প্রাণীর আকৃতিবিশিষ্ট যেকোনো মূর্তি, খেলনা বা কার্টুন তৈরি করা, ঘরে সংরক্ষণ করা এবং বেচাকেনা করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। শিশুদের খেলার জন্য হলেও আধুনিক যুগের প্রাণবন্ত ও সুস্পষ্ট অবয়বযুক্ত খেলনা মূর্তিগুলো পরিহার করা আবশ্যক।
See lessপ্রাণীর ছবি বা আকৃতি প্রস্তুতকারীদের প্রতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন এবং তাদের ওপর লানত (অভিশাপ) করেছেন। এই ধরনের মূর্তি বা খেলনা যারা তৈরি করে, হাশরের ময়দানে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে এগুলোতে প্রাণ দেওয়ার নির্দেশ দেবেন, যা তাদের পক্ষে কখনোই সম্ভব হবে না। ফলে তারা কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হবে।
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
إِنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَذَابًا عِنْدَ اللَّهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ الْمُصَوِّرُونَ
অর্থ: “কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে সবচেয়ে কঠিন শাস্তি ভোগ করবে ছবি বা মূর্তি প্রস্তুতকারীরা।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৫৬ এবং সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২১০৯]
অন্য একটি হাদিসে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
مَنْ صَوَّرَ صُورَةً فِي الدُّنْيَا كُلِّفَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَنْ يَنْفُخَ فِيهَا الرُّوحَ، وَلَيْسَ بِنَافِخٍ
অর্থ: “যে ব্যক্তি দুনিয়াতে কোনো (প্রাণীর) ছবি বা মূর্তি তৈরি করবে, কিয়ামতের দিন তাকে নির্দেশ দেওয়া হবে সে যেন তাতে রূহ ফুঁকে দেয়, অথচ সে কখনোই তা ফুঁকতে সক্ষম হবে না।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৬৩]
এই ধরনের খেলনা মূর্তিগুলো মূলত ভিন্ন সংস্কৃতির একটি আগ্রাসন। ছোটবেলা থেকেই শিশুদের হাতে এসব মূর্তি তুলে দেওয়ার ফলে তাদের কচি মনে মূর্তির প্রতি এক ধরনের ভালোবাসা ও আকর্ষণ তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে তাদের বিশুদ্ধ আকিদাহ ও তাওহীদের চেতনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ইসলাম মূর্তি ও শিরকের মূলোৎপাটন করতে এসেছে, তাই এর যেকোনো প্রতিচ্ছবি থেকে মুসলিম শিশুদের দূরে রাখা অভিভাবকদের ঈমানি দায়িত্ব।
এর বিকল্প হিসেবে শিশুদেরকে প্রাণহীন বস্তুর খেলনা দেওয়া যেতে পারে। যেমন: ফলমূল, ফুল, গাছপালা, গাড়ি, বিমান বা বিভিন্ন ধরনের ব্লক নির্মাণ সামগ্রী। এগুলো দিয়ে খেলা করা সম্পূর্ণ হালাল এবং এতে শিশুদের মানসিক বিকাশও ঘটে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের পরিবার ও সন্তানদেরকে শিরক এবং হারাম থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
প্রশ্ন নং ৫৩ ‣ কসর শেষে মুকীম হলে নফল সুন্নত সালাত আদায় করা যাবে কি?
সফর বা ভ্রমণের সময় চার রাকাতবিশিষ্ট তিনটি ফরজ সালাতকে (যোহর, আসর এবং ইশা) কসর করে দুই রাকাত পড়া শরিয়তের বিধান। এ সময় ফরজের সাথে যুক্ত সুন্নাতে মুয়াক্কাদা বা রাতেবা (যেমন যোহর, আসর, মাগরিব ও ইশার সুন্নাত) না পড়াই হলো সুন্নাহ। সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: صَحِبْتُ رَسRead more
সফর বা ভ্রমণের সময় চার রাকাতবিশিষ্ট তিনটি ফরজ সালাতকে (যোহর, আসর এবং ইশা) কসর করে দুই রাকাত পড়া শরিয়তের বিধান। এ সময় ফরজের সাথে যুক্ত সুন্নাতে মুয়াক্কাদা বা রাতেবা (যেমন যোহর, আসর, মাগরিব ও ইশার সুন্নাত) না পড়াই হলো সুন্নাহ।
See lessসাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
صَحِبْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَكَانَ لَا يَزِيدُ فِي السَّفَرِ عَلَى رَكْعَتَيْنِ وَأَبَا بَكْرٍ وَعُمَرَ وَعُثْمَانَ كَذَلِكَ
অর্থ: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে সফর করেছি, তিনি সফরে ফরজ দুই রাকাতের বেশি পড়তেন না। আবু বকর, উমর এবং উসমান (রা.) এর আমলও এমনটিই ছিল। [সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১০২]
তবে ফজরের দুই রাকাত সুন্নাত এবং বিতরের সালাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফর অবস্থাতেও তা কখনো ছাড়তেন না।
প্রথমত, যখন মুসাফির ব্যক্তি রাস্তার মাঝে চলমান অবস্থায় থাকে, তখন তার জন্য ফরজের সাথে অন্য কোনো সুন্নাত না পড়াই উত্তম।
দ্বিতীয়ত, সফর অবস্থায় গন্তব্যে পৌঁছে যদি সে কোনো স্থানে সাময়িক অবস্থান করে (যেমন হোটেলে বা আত্মীয়ের বাড়িতে), তখন তার জন্য কসরের পাশাপাশি অন্যান্য সাধারণ নফল, চাশত বা তাহাজ্জুদের মতো সালাত আদায় করা জায়েজ এবং উত্তম।
আর আপনার প্রশ্নের মূল অংশটি হলো কসর শেষে মুকিম হওয়ার ব্যাপারে। যখন একজন ব্যক্তি তার সফর শেষ করে নিজ বাড়িতে বা শহরে ফিরে আসেন এবং মুকিম হয়ে যান, তখন তার ওপর থেকে সফরের সকল বিধান উঠে যায়। মুকিম অবস্থায় তাকে অন্যান্য সাধারণ সময়ের মতোই সালাত আদায় করতে হবে এবং নিয়মিত সকল সুন্নাত ও নফল সালাতগুলো যথাযথভাবে পালন করতে হবে। তখন আর সুন্নাত ছাড়ার কোনো অবকাশ থাকে না।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
প্রশ্ন নং ৫২ ‣ লা-হাওলা ওয়া-লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ। এখানে "হাওলা" শব্দের অর্থ কী?
"লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ" (لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ) ইসলামে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ এবং ফজিলতপূর্ণ একটি যিকির। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই বাক্যটিকে জান্নাতের গুপ্তধনগুলোর অন্যতম হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আবু মুসা আল আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাRead more
“লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ” (لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ) ইসলামে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ এবং ফজিলতপূর্ণ একটি যিকির। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই বাক্যটিকে জান্নাতের গুপ্তধনগুলোর অন্যতম হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
See lessআবু মুসা আল আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেন:
يَا عَبْدَ اللَّهِ بْنَ قَيْسٍ، أَلاَ أَدُلُّكَ عَلَى كَنْزٍ مِنْ كُنُوزِ الجَنَّةِ؟ فَقُلْتُ: بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ، قَالَ: قُلْ لاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ
অর্থ: “হে আব্দুল্লাহ ইবনে কাইস! আমি কি তোমাকে জান্নাতের গুপ্তধনগুলোর মধ্য থেকে একটি গুপ্তধনের সন্ধান দেব না? আমি বললাম, হ্যাঁ হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন, তুমি বলো: লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩৮৪ এবং সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭০৪]
“হাওলা” (حَوْل) শব্দটির আভিধানিক অর্থ হলো পরিবর্তন হওয়া, এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় রূপান্তরিত হওয়া, ফিরে আসা বা আশ্রয় নেওয়া। আর পরিভাষায় এবং এই যিকিরের প্রেক্ষাপটে “লা হাওলা” এর অর্থ হলো, আল্লাহর সাহায্য ও আশ্রয় ছাড়া বান্দার নিজের কোনো অবস্থা পরিবর্তন করার ক্ষমতা নেই। সালাফে সালেহীনগণ এই বাক্যটির চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
প্রখ্যাত সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) এই বাক্যটির তাফসিরে বলেন:
لَا حَوْلَ عَنْ مَعْصِيَةِ اللَّهِ إِلَّا بِعِصْمَتِهِ، وَلَا قُوَّةَ عَلَى طَاعَتِهِ إِلَّا بِمَعُونَتِهِ
অর্থ: “আল্লাহর অবাধ্যতা ও পাপ থেকে ফিরে আসার কোনো উপায় বা ক্ষমতা (হাওলা) নেই তাঁর সুরক্ষা ও আশ্রয় ছাড়া, এবং তাঁর আনুগত্য করার কোনো শক্তি (কুওয়াহ) নেই তাঁর সাহায্য ছাড়া।” [মুসনাদ আল-বাযযার, হাদিস: ৩৪৭২; হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি ও আল্লামা ইরাকি (রহ.) এর সনদকে সহিহ বলেছেন]
সুতরাং, “হাওলা” বলতে এখানে নিজের অবস্থা পরিবর্তনের ক্ষমতা এবং আল্লাহর আশ্রয় ছাড়া অন্য কোনো আশ্রয় না থাকার বিষয়টি বোঝানো হয়েছে। এর মাধ্যমে একজন মুমিন নিজের সম্পূর্ণ অক্ষমতা স্বীকার করে নেন এবং প্রমাণ করেন যে, ভালো কাজ করার শক্তি এবং মন্দ কাজ থেকে বেঁচে থাকার ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে মহান আল্লাহর সাহায্য ও ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। আল্লাহ আমাদের বেশি বেশি এই যিকিরটি পাঠ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
প্রশ্ন নং ৫১ ‣ প্রাণীর ছবিযুক্ত কাপড়ে সালাত আদায় করা যাবে কি?
ইসলামী শরীয়তে যেকোনো প্রাণীর (যার রূহ বা প্রাণ আছে) ছবি আঁকা, ব্যবহার করা এবং এমন ছবিযুক্ত পোশাক পরিধান করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আর সালাতের মতো পবিত্র ও মহান ইবাদতের সময় এমন পোশাক পরিধান করা আরও বড় অপরাধ। যদি কোনো পোশাকে কোনো প্রাণীর স্পষ্ট ছবি অঙ্কিত থাকে, তাহলে সেই পোশাক পরে সালাত আদায় করলে সালাতRead more
ইসলামী শরীয়তে যেকোনো প্রাণীর (যার রূহ বা প্রাণ আছে) ছবি আঁকা, ব্যবহার করা এবং এমন ছবিযুক্ত পোশাক পরিধান করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আর সালাতের মতো পবিত্র ও মহান ইবাদতের সময় এমন পোশাক পরিধান করা আরও বড় অপরাধ।
See lessযদি কোনো পোশাকে কোনো প্রাণীর স্পষ্ট ছবি অঙ্কিত থাকে, তাহলে সেই পোশাক পরে সালাত আদায় করলে সালাত হবে না। ছবিযুক্ত পোশাকে সালাত আদায় করা নিষিদ্ধ এবং এটি সালাতের খুশু খুজু বা একাগ্রতা নষ্ট করে দেয়। রহমতের ফেরেশতারাও এমন স্থানে প্রবেশ করেন না যেখানে প্রাণীর ছবি থাকে।
আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, আয়েশা (রা.) এর একটি পর্দা ছিল, যা দিয়ে তিনি ঘরের এক দিক ঢেকে রেখেছিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন:
أَمِيطِي عَنَّا قِرَامَكِ هَذَا، فَإِنَّهُ لَا تَزَالُ تَصَاوِيرُهُ تَعْرِضُ لِي فِي صَلَاتِي
অর্থ: “তোমার এই পর্দাটি আমার সামনে থেকে সরিয়ে ফেলো। কারণ সালাতরত অবস্থায় এর ছবিগুলো বারবার আমার সামনে ভেসে উঠছে।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৭৪]
তবে ছবির ক্ষেত্রে শরিয়তের একটি সুনির্দিষ্ট ছাড় রয়েছে, যদি ছবির প্রাণকেন্দ্র অর্থাৎ মাথা বা গলার ওপরের অংশ মুছে ফেলা বা কেটে ফেলা হয় এবং বাকি অঙ্গগুলো অস্পষ্ট থাকে, যার ফলে এটি আর কোনো পূর্ণাঙ্গ প্রাণীর আকৃতি বহন করে না (বরং গাছ বা জড় বস্তুর মতো মনে হয়), তবে সেই পোশাক পরিধান করা জায়েজ এবং তা পরে সালাত আদায় করলে সালাত শুদ্ধ হয়ে যাবে।
এর শক্তিশালী দলিল হলো, জিবরীল (আ.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ছবির ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছিলেন:
فَمُرْ بِرَأْسِ التِّمْثَالِ الَّذِي فِي الْبَيْتِ يُقْطَعُ، فَيَصِيرُ كَهَيْئَةِ الشَّجَرَةِ
অর্থ: “সুতরাং আপনি ঘরে থাকা মূর্তির (বা প্রাণীর আকৃতির) মাথা কেটে ফেলার নির্দেশ দিন, যাতে তা গাছের রূপ ধারণ করে।” [সুনান তিরমিজি, হাদিস: ২৮০৬; সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৪১৫৮; শায়খ আলবানি (রহ.) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন]
এছাড়াও প্রখ্যাত সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি বিশুদ্ধ আসারে এসেছে:
الصُّورَةُ الرَّأْسُ، فَإِذَا قُطِعَ الرَّأْسُ فَلَيْسَ بِصُورَةٍ
অর্থ: “ছবি হলো মূলত মাথা। সুতরাং যখন মাথা কেটে ফেলা হয়, তখন তা আর ছবি থাকে না।” [সুনান আল-বায়হাকি, হাদিস: ১৪৫৮১; শায়খ আলবানি (রহ.) আস-সিলসিলাতুস সহিহাহ গ্রন্থে (১৯২১ নম্বর) একে সহিহ বলেছেন]
সারসংক্ষেপ হলো, সালাতের জন্য শরীর ও পোশাক পবিত্র এবং শরিয়তসম্মত হওয়া আবশ্যক। তাই প্রাণীর স্পষ্ট ছবিযুক্ত পোশাকে সালাত আদায় করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বিশুদ্ধভাবে ইবাদত করার তাওফিক দান করুন। আমিন।