এক সাথে তিন তালাক দিলে কি তিন তালাক হবে নাকি এক তালাক হবে? রাগ করে স্ত্রীকে তার বাবার বাড়ি যেতে বললে কি তালাক হবে?
Please briefly explain why you feel this question should be reported.
Please briefly explain why you feel this answer should be reported.
Please briefly explain why you feel this user should be reported.
আপনার প্রশ্নে মূলত দুটি ভিন্ন বিষয় রয়েছে।
প্রথম অংশ: একসাথে তিন তালাক দেওয়ার বিধান
ইসলামী শরীয়তে একসাথে একই মজলিসে তিন তালাক দেওয়া বিদআত এবং এটি একটি হারাম কাজ। কেউ যদি অজ্ঞতাবশত বা রাগের বশবর্তী হয়ে এমনটি করে, তবে বিশুদ্ধ মত এবং সালাফি উলামায়ে কেরামের ফতোয়া অনুযায়ী তা এক তালাক বা ‘তালাকে রাজয়ী’ (প্রত্যাহারযোগ্য তালাক) হিসেবে গণ্য হবে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে একসাথে তিন তালাক দেওয়াকে অত্যন্ত গর্হিত কাজ মনে করা হতো। মাহমুদ ইবনে লাবীদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
أُخْبِرَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ رَجُلٍ طَلَّقَ امْرَأَتَهُ ثَلَاثَ تَطْلِيقَاتٍ جَمِيعًا فَقَامَ غَضْبَانًا ثُمَّ قَالَ أَيُلْعَبُ بِكِتَابِ اللَّهِ وَأَنَا بَيْنَ أَظْهُرِكُمْ
অর্থ: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এমন এক ব্যক্তি সম্পর্কে জানানো হলো, যে তার স্ত্রীকে একসাথে তিন তালাক দিয়েছে। তখন তিনি রাগান্বিত হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং বললেন, আমি তোমাদের মাঝে জীবিত থাকতেই কি আল্লাহর কিতাব নিয়ে খেলা করা হচ্ছে? এমনকি এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি কি তাকে হত্যা করব?” [সুনান আন-নাসায়ী, হাদিস: ৩৪০১; শায়খ আলবানি (রহ.) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন]
একসাথে দেওয়া তিন তালাক যে এক তালাক হিসেবেই গণ্য হয়, তার অকাট্য দলিল হলো আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) এর হাদিস। তিনি বলেন:
كَانَ الطَّلاَقُ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَأَبِي بَكْرٍ وَسَنَتَيْنِ مِنْ خِلاَفَةِ عُمَرَ طَلاَقُ الثَّلاَثِ وَاحِدَةً
অর্থ: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে, আবু বকর (রা.) এর যুগে এবং উমর (রা.) এর খিলাফাতের প্রথম দুই বছর পর্যন্ত একসাথে দেওয়া তিন তালাক এক তালাক হিসেবেই গণ্য হতো।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪৭২]
পরবর্তীতে মানুষ যখন এই ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন শুরু করল এবং একসাথে তিন তালাক দেওয়ার প্রবণতা বাড়িয়ে দিল, তখন খলিফা উমর (রা.) মানুষের জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা (তাযির) হিসেবে এটিকে তিন তালাক হিসেবে প্রয়োগ করার প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে শরিয়তের মূল বিধান হলো এটি এক তালাক হিসেবেই ধর্তব্য হবে। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.), ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) সহ সমসাময়িক অধিকাংশ বড় উলামায়ে কেরামের ফতোয়া এটিই।
সুন্নাহসম্মত তালাকের পদ্ধতি:
তালাক দেওয়ার সুন্নাহ পদ্ধতি হলো, স্ত্রীর এমন পবিত্র অবস্থায় (তুহুর) তাকে কেবল এক তালাক দেওয়া, যে পবিত্র অবস্থায় স্বামীর সাথে তার কোনো শারীরিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়নি। এরপর স্ত্রী তার স্বামীর বাড়িতেই ইদ্দত পালন করবে। ইদ্দত হলো স্ত্রীর তিনটি মাসিক ঋতুস্রাব (পিরিয়ড) পার হওয়া। এই ইদ্দত চলাকালীন যেকোনো সময় স্বামী চাইলে স্ত্রীকে মৌখিক বা শারীরিকভাবে ফিরিয়ে নিতে (রুজু করতে) পারবে।
যদি ইদ্দত শেষ হয়ে যায় এবং স্বামী রুজু না করে, তবে স্ত্রী ‘বাইন’ তালাকপ্রাপ্তা হয়ে যাবে। তখন সে মুক্ত এবং চাইলে অন্য কাউকে বিবাহ করতে পারবে। আর যদি প্রথম স্বামী-স্ত্রী উভয়ে আবার একসাথে সংসার করতে রাজি হয়, তবে তারা নতুন করে মোহরানা নির্ধারণ করে পুনরায় বিবাহ (আকদ) করতে পারবে।
কিন্তু স্বামী যদি তিন ধাপে (আলাদা আলাদা তিনটি পবিত্র অবস্থায়) তিনবার তালাক দেয়, তবে স্ত্রী চিরতরে হারাম হয়ে যাবে (তালাকে মুগাল্লাযাহ)। এরপর সে স্ত্রী অন্য কোথাও স্বাভাবিকভাবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যদি কখনো স্বামী মারা যায় বা তালাকপ্রাপ্ত হয়, কেবল তখনই সে পূর্বের স্বামীর জন্য হালাল হতে পারে। পূর্বপরিকল্পিত চুক্তিভিত্তিক বিবাহ বা ‘হালালা’ শরীয়তে সম্পূর্ণ হারাম এবং অভিশপ্ত।
দ্বিতীয় অংশ: রাগ করে বাবার বাড়ি যেতে বলা
ইসলামী ফিকহ অনুযায়ী, রাগ করে স্ত্রীকে “বাবার বাড়ি চলে যাও” বা “তোমার পরিবারের কাছে ফিরে যাও” বলাটা তালাকের সুস্পষ্ট শব্দ (সরিহ) নয়, বরং এটি তালাকের ইঙ্গিতবহ শব্দ (কিনায়াহ)।
ইঙ্গিতবহ শব্দ দ্বারা তালাক পতিত হওয়া বা না হওয়া সম্পূর্ণ নির্ভর করে স্বামীর নিয়তের ওপর।
১. স্বামী যদি “বাবার বাড়ি চলে যাও” বলার সময় মনে মনে তালাক দেওয়ার নিয়ত করে থাকে, তবে এক তালাক (রাজয়ী) পতিত হবে।
২. আর যদি সে তালাকের নিয়ত না করে কেবল রাগ সামলাতে, ধমক দিতে বা কিছুদিনের জন্য তাকে বাবার বাড়িতে পাঠাতে চেয়ে এই কথা বলে থাকে, তবে এর দ্বারা কোনো তালাক হবে না।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কাব ইবনে মালিক (রা.) কে তার স্ত্রীর কাছ থেকে সাময়িক আলাদা থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন, তখন কাব (রা.) জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আমি কি তাকে তালাক দেব?” নবীজি বললেন, “না, তুমি কেবল তার থেকে আলাদা থাকো।” তখন কাব (রা.) তার স্ত্রীকে বলেছিলেন, “الحقي بأهلك” (তুমি তোমার পরিবারের কাছে চলে যাও)। যেহেতু কাব (রা.) এর তালাকের নিয়ত ছিল না, তাই সেখানে কোনো তালাক পতিত হয়নি। [সহিহ বুখারি ও মুসলিম]
সুতরাং, এ ক্ষেত্রে স্বামীর নিয়ত কী ছিল, তার ভিত্তিতেই ফয়সালা হবে। আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।