একজন ভাইয়ের স্ত্রী একটি বাচ্চা নিয়ে আর বাচ্চা নিবে না পরিষ্কার ভাবে জানিয়ে দিয়েছে। শরিয়াহর আলোকে এর ফায়সালা কী হবে? সেই স্ত্রী স্বামীর যথাযথ চাহিদাও মিটাতে পারছে না। স্বামী যদি একারনে রাগ করে, উল্টো স্ত্রীও রাগ করে। স্ত্রী কোনো সময় এর জন্য অনুতপ্ত হয় না বা স্বামীকে খুশি করার চেষ্টা করে না। এভাবে ৮ বছর পার হল। ঐ ভাইয়ের এখন কী করণীয়?
প্রশ্নে উল্লেখিত পরিস্থিতির আলোকে ইসলামী শরীয়তের বিধান অত্যন্ত সুস্পষ্ট। এখানে স্ত্রীর পক্ষ থেকে দুটি মারাত্মক শরয়ি ত্রুটি ও অবাধ্যতা প্রকাশ পাচ্ছে। কুরআন, সহিহ সুন্নাহ এবং সালাফে সালেহীনদের বিশুদ্ধ মানহাজ অনুযায়ী এর সমাধান হলো:
প্রথমত: সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে
সন্তান দান করা বা না করা সম্পূর্ণ মহান আল্লাহর ইখতিয়ার। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন:
لِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ يَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ إِنَاثًا وَيَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ الذُّكُورَ
অর্থ: “আসমান ও জমিনের রাজত্ব একমাত্র আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যাসন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্রসন্তান দান করেন।” [সূরা আশ শুরা: ৪৯]
ইসলামে উপযুক্ত শরয়ি ওজর বা মায়ের জীবনের ঝুঁকির মতো চরম শারীরিক অক্ষমতা ছাড়া স্থায়ীভাবে জন্ম নিয়ন্ত্রণ করা বা আর কখনোই সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্পূর্ণ নাজায়েজ এবং ফিতরাত বিরোধী একটি কাজ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতকে বেশি বেশি সন্তান জন্মদানের নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি বলেছেন:
تَزَوَّجُوا الْوَدُودَ الْوَلُودَ إِنِّي مُكَاثِرٌ بِكُمُ الأَنْبِيَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
অর্থ: “তোমরা এমন নারীকে বিবাহ করো, যে বেশি প্রেমময়ী এবং অধিক সন্তান প্রসবকারিণী। কারণ কিয়ামতের দিন আমি অন্যান্য নবীদের সামনে তোমাদের আধিক্য নিয়ে গর্ব করব।” [সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ২০৫০; শায়খ আলবানি (রহ.) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন]
তাই আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর নিজের সিদ্ধান্তকে চাপিয়ে দেওয়া চরম আকিদাগত দুর্বলতা ও অজ্ঞতা। অনেক সম্পদশালী ব্যক্তি একটি সন্তান নিয়ে আর সন্তান নিতে চাননি, পরবর্তীতে দুর্ঘটনায় সেই সন্তান মারা যাওয়ার পর তারা সারাজীবন অনুশোচনা করেছেন। তাই এই স্ত্রীর উচিত নিজের ঈমান ও আকিদাহ পরিশুদ্ধ করা এবং আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট হওয়া।
দ্বিতীয়ত: স্বামীর ডাকে সাড়া না দেওয়া
কোনো স্ত্রীর জন্য শরয়ি ওজর (যেমন মাসিক, নেফাস বা চরম অসুস্থতা) ছাড়া স্বামীর ডাকে সাড়া না দেওয়া বা শারীরিক সম্পর্ক থেকে বিরত থাকা একটি কবিরা গুনাহ। এর ফলে সে আল্লাহর লানত ও ফেরেশতাদের অভিশাপের পাত্রী হয়।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
إِذَا دَعَا الرَّجُلُ امْرَأَتَهُ إِلَى فِرَاشِهِ فَأَبَتْ فَبَاتَ غَضْبَانَ عَلَيْهَا لَعَنَتْهَا الْمَلاَئِكَةُ حَتَّى تُصْبِحَ
অর্থ: “স্বামী যখন তার স্ত্রীকে বিছানায় ডাকে, আর স্ত্রী যদি তা অস্বীকার করে এবং স্বামী তার ওপর রাগ করে রাত কাটায়, তাহলে সকাল হওয়া পর্যন্ত ফেরেশতারা সেই স্ত্রীর ওপর অভিশাপ দিতে থাকে।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২৩৭ এবং সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪৩৬]
তৃতীয়ত: স্বামীর করণীয় এবং বহুবিবাহের সমাধান
দীর্ঘ ৮ বছর ধরে স্ত্রী যদি এমন আচরণ করে এবং অনুতপ্ত না হয়, তবে স্বামীর নিজের চরিত্র ও ঈমান হেফাজত করা ফরজ। একজন সক্ষম পুরুষের জন্য নিজের পবিত্রতা রক্ষার্থে এবং চোখের হিফাজতের জন্য একাধিক বিবাহ করা শরীয়তসম্মত ও উত্তম একটি সমাধান।
জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
إِذَا أَحَدُكُمْ أَعْجَبَتْهُ الْمَرْأَةُ فَوَقَعَتْ فِي قَلْبِهِ فَلْيَعْمِدْ إِلَى امْرَأَتِهِ فَلْيُوَاقِعْهَا فَإِنَّ ذَلِكَ يَرُدُّ مَا فِي نَفْسِهِ
অর্থ: “যদি তোমাদের কারো কোনো নারীর প্রতি দৃষ্টি পড়ে এবং তার প্রতি আকৃষ্ট হয়, তবে সে যেন তার স্ত্রীর কাছে যায় এবং তার সাথে মিলিত হয়। এটি তার অন্তরের কুমন্ত্রণা দূর করে দেবে।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪০৩]
এখন প্রথম স্ত্রী যদি মাসের পর মাস স্বামীর প্রয়োজন পূরণে অপারগ বা অবাধ্য হয়, তবে দ্বিতীয় স্ত্রী থাকলে স্বামী সহজেই নিজেকে হারাম থেকে বাঁচাতে পারে। সালাফে সালেহীনগণ সক্ষম পুরুষদের বিবাহের প্রতি উৎসাহ দিতেন। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) তার ছাত্র সাঈদ ইবনে জুবায়েরকে বলেছিলেন, “বিবাহ করো, কেননা এই উম্মতের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির (অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর) সবচেয়ে বেশি স্ত্রী ছিল।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৬৯]
চতুর্থত: স্ত্রীদের মাঝে সমতা বিধান এবং প্রথম স্ত্রীর আচরণ
যদি স্বামী দ্বিতীয় বিবাহ করেন, তবে প্রথম স্ত্রীর কোনো অধিকার নেই তাতে বাধা দেওয়া বা সতিনের তালাক দাবি করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
لاَ تَسْأَلِ الْمَرْأَةُ طَلاَقَ أُخْتِهَا لِتَسْتَفْرِغَ صَحْفَتَهَا
অর্থ: “কোনো নারী যেন তার (মুসলিম) বোনের তালাক দাবি না করে, যাতে তার পাত্রটি সে একাই শূন্য করে নিতে পারে। সে যেন বিবাহ বন্ধনে থাকে, কারণ তার তাকদিরে যা আছে সে তা পাবেই।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫১৫২]
তবে স্বামীকে অবশ্যই একাধিক স্ত্রীর মাঝে সময়, রাত্রীযাপন এবং ভরণপোষণের ক্ষেত্রে পূর্ণ ইনসাফ ও সমতা বজায় রাখতে হবে। এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল দায়িত্ব। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সতর্ক করে বলেছেন:
مَنْ كَانَتْ لَهُ امْرَأَتَانِ فَمَالَ إِلَى إِحْدَاهُمَا جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَشِقُّهُ مَائِلٌ
অর্থ: “যে ব্যক্তির দুজন স্ত্রী আছে কিন্তু সে তাদের একজনের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ল (অর্থাৎ বৈষম্য করল), সে কিয়ামতের দিন এমন অবস্থায় উঠবে যে তার শরীরের একাংশ অবশ বা ঝুলন্ত থাকবে।” [সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ২১৩৩; শায়খ আলবানি (রহ.) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন]
(অন্তরের ভালোবাসা মানুষের নিয়ন্ত্রণে নেই, তাই শুধুমাত্র বাহ্যিক এবং বৈষয়িক সমতা বিধানই স্বামীর ওপর ফরজ)।
সুতরাং উক্ত ভাইয়ের উচিত প্রথমে স্ত্রীকে কুরআন ও সুন্নাহর ভয় দেখিয়ে সংশোধন করার চেষ্টা করা। প্রয়োজনে দুই পরিবারের মুরব্বিদের নিয়ে শালিস করা। যদি স্ত্রী এরপরও অবাধ্যতায় অটল থাকে, তবে স্বামী নিজের চরিত্র রক্ষার্থে ইনসাফ করার সামর্থ্য সাপেক্ষে দ্বিতীয় বিবাহ করতে পারেন অথবা শরীয়তের নিয়ম অনুযায়ী তাকে তালাক দিয়ে একজন দ্বীনদার ও অনুগত নারীকে বিবাহ করতে পারেন। আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।